নানা আলোচনা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার জনপ্রশাসন-বিষয়ক সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপুর্ণ কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম নিকারের (প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি) বৈঠকে সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে কবে নাগাদ নিকারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে তা চূড়ান্ত করেনি।
জানা গেছে, জনপ্রশাসনের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতেই সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কারে ১০ দফা সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবেই কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদের নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব নিকারের বৈঠকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত জুলাই মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই নির্দেশনার আলোকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কারের জন্য গঠিত একটি কমিটি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির বর্তমান সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা।
এদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের দেওয়া দুই শতাধিক সুপারিশের বেশিরভাগ বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ও অন্য ক্যাডার বা প্রস্তাবিত সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ৫০ : ৫০ পদোন্নতি, এটা আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর দেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করে প্রাদেশিক সিস্টেমে গেলে ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে এটা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রাদেশিক সিস্টেম চালু করতে কয়েক লাখ কোটি টাকার দরকার। সেই সামর্থ্য রাষ্ট্রের নাই। শুধু তাই নয়, প্রদেশ বা সিটি গভর্নমেন্ট করলে মাথাভারী প্রশাসন এবং সরকারের কলেবর বাড়বে। এ কারণে বর্তমান সরকার আপাতত এসব সুপারিশ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।
সূত্র জানিয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী গঠিত হচ্ছে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস (এসইএস)। এই নতুন কাঠামোর অধীনে উপসচিব থেকে শুরু করে সচিব এমনকি সিনিয়র সচিব পর্যন্ত সব পদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিভিন্ন ক্যাডার থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে এসইএস-এ। বর্তমানে উপসচিব পদ থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত পদগুলোকে সরকারের পদ বলা হয়। প্রশাসন ক্যাডারের ৭৫ শতাংশ এবং অন্য সব ক্যাডারের ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। যদিও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত শতভাগ পদে পদোন্নতির দাবি জানিয়ে আসছেন। আর প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্য সব ক্যাডারের কর্মকর্তারা পরীক্ষা নিয়ে উপসচিবের শতভাগ পদে পদোন্নতির দাবি জানিয়েছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বাাংলা ট্রিবিউন জানান, জনপ্রশাসন সংস্কার বিষয়ক কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট দফতরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ডিসির পদবি পরিবর্তন করে ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার’ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদবি পরিবর্তন করে ‘উপজেলা কমিশনার’ করার পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটিকে (নিকার) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই এসব বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, এর বাইরেও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন। এই ১৮ প্রস্তাবের মধ্যে ৮টি সুপারিশ অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। এগুলো হলো— মহাসড়কের পেট্রলপাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটসংক্রান্ত, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটকে ডায়নামিক করা, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা, গণশুনানি, তথ্য অধিকার আইন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পুনর্গঠন এবং ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা। যদিও এই ৮ সুপারিশও বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক একজন কেবিনেট সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আমার মনে হয়, কমিশনের অনেক সুপারিশই গায়েবি। তার মধ্যেও যেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব সেগুলো এবং যেগুলো বাস্তবায়নে সাধারন মানুষের জন্য কল্যাণকর বা সাধারণ নাগরিকদের উন্নতসেবা নিশ্চিত করবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, সেগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে মনে করি। এ ছাড়া আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কম। এই কম সময়ের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ঢন সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকার আমাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেনে ভালো লাগছে। আমরা সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। এখন সরকারের কাজ হলো এগুলো বাস্তবায়ন করা। সরকার তার সাধ্য, সামর্থ্য ও সময় অনুয়ায়ী সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে, এমন কোনও শর্ত আমাদের দিক থেকে নেই।