জ্বলছে লাল-সবুজ বাতি, তবু ‘ভরসা’ হাতের ইশারা

জ্বলছে লাল-সবুজ বাতি, তবু ‘ভরসা’ হাতের ইশারা

রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা যানজট। শহরের তীব্র যানজটের কারণে দুর্ঘটনার পাশাপাশি কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন নাগরিকরা। যানজট নিরসনে সড়কে নতুন করে ট্রাফিক ‘ল্যাম্পপোস্ট’ বা ‘সড়কবাতি’ বসানো হয়েছে, যা নব্বই দশকে বিদ্যমান ছিল।

যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ আর পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়কগুলোতে দিনরাত জ্বলে লাল-সবুজ বাতি। কিন্তু বাস্তবে সেই বাতির প্রতি নজর নেই পথচারী ও চালকদের। সড়কে লাল আলো জ্বললেও মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, রিকশা থেকে শুরু করে বাস- সব যানবাহনই যেন দৌড়ে যেতে ব্যস্ত। পথচারীরাও চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হন, উপেক্ষা করেন সিগন্যালের নির্দেশনা।

এদিকে সড়কবাতির সংকেত সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড করছে ট্রাফিক বিভাগ। প্রতিটি সিগন্যালে সড়কবাতির পাশাপাশি মাইকিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং ও সড়কবাতি মেনে চলার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের দিয়েও নানা প্রচারণা চালাচ্ছে বাহিনীটি।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cd435fd6183" ) );

রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামটর, কাওরান বাজার, বিজয় সরণি ও ফার্মগেট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এ চিত্র দেখা যায়। শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত প্রতিটি ইন্টারসেকশনে (মোড়) ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে। লাল বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন থামার কথা থাকলেও বেশিরভাগ চালকই সেটি মানেন না। অনেকে শেষ মুহূর্তে গতি বাড়িয়ে চলে যাচ্ছেন। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও সিগন্যাল ভাঙার প্রবণতা কমেনি। ফলে বাধ্য হয়ে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা আগের মতোই হাতের ইশারায় গাড়ি থামাচ্ছেন।

পথচারীরাও ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করে মাঝ রাস্তা পার হচ্ছেন। ফুট ওভারব্রিজ থাকা জায়গাগুলোতেও অনেকে সড়ক দিয়ে পারাপার হচ্ছেন। এতে যানবাহন থেমে যেতে বাধ্য হয়, তৈরি হয় জট, আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে সব সময়।

পথচারীদের অভিযোগ, ফুট ওভারব্রিজের নকশা অসুবিধাজনক এবং অনেক উঁচু। আবার তাতে নেই এস্কেলেটর। ফলে ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত পারাপারে সড়ক ব্যবহার করছেন তারা।

স্কুলের দুই শিক্ষার্থীকে নিয়ে ফার্মগেটে রাস্তা পারাপার হওয়া এক অভিভাবক বলেন, ‘সড়ক নকশা ও ফুট ওভারব্রিজের স্থাপনা যুগোপযোগী নয়। এমনভাবে ডিজাইন করা যাতে রাস্তা পারাপার হতে গেলে অনেক দূর ঘুরে আসতে হয়। এছাড়া এখানকার একটি ব্রিজেও এস্কেলেটর বা লিফট নেই। ফুট ওভারব্রিজগুলো অনেক উঁচু ও ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য নেই।’

১৮ সেপ্টেম্বর এসব এলাকায় সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়। সড়কে লাল-সবুজ বাতির সংকেত থাকার পরও কেন হাত নিয়ে যানবাহন থামাচ্ছেন- এমন প্রশ্নে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সড়কবাতির সংকেত ছিল না। ফলে সাধারণভাবেই তারা (চালকরা) লাল-সবুজ সংকেত মানতে চাইছেন না। তবে এটা তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই করছেন। কেননা চালকের লাইসেন্স গ্রহণ করার সময়ে তারা এসব বিষয়ে অবগত। তারা আইন মানছেন না বলেই বাধ্য হয়ে আমাদের সড়কবাতির সংকেতের পাশাপাশি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারা দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।’

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cd435fd61e0" ) );

বিজয় সরণিতে দায়িত্বরত ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের পরিদর্শক (টিআই) সুজা চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সড়কবাতির বিষয়টি ছিল না। তাই এখনও সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাওরান বাজার এলাকায় দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, ‘আমরা সিগন্যাল ভাঙার জন্য মামলা করি, কিন্তু চালকরা মামলা দিয়ে আবারও একই কাজ করেন। জেল বা লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা না থাকলে সিগন্যাল মানানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা কঠিন।’

তবে চালকরা জানিয়েছেন, অনেক সিগন্যাল ঠিকমতো কাজ করে না বা ভুল সময় দেয়। ফলে তারা দ্রুত যাওয়ার জন্য সিগন্যাল মানেন না।

মিরপুর থেকে আসা বিকল্প পরিবহনের একটি বাসের চালক হামিদ মিয়া বলেন, ‘কখনও লাল বাতি তিন মিনিট জ্বলে থাকে, তখন রাস্তায় গাড়ির চাপ বাড়ে। আবার কখনও সবুজ বাতি কম সময় দেয়। এতে গতি বাড়াতে বাধ্য হই।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিগন্যাল ভাঙা এখন চালকদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তারা বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হবে, চালক ও পথচারীদের শৃঙ্খলায় আনা যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিগন্যাল মানা মানে কেবল আইন মানা নয়। এটি এক ধরনের নাগরিক সংস্কৃতি। আমরা সেটি হারিয়ে ফেলেছি।’

ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে রাজধানীতে সিগন্যাল অমান্যের কারণে অন্তত ২ হাজারের বেশি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই এ সংখ্যা প্রায় একই পর্যায়ে। পুলিশ বলছে, রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় সিসিটিভি থাকলেও মামলা দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল এবং জনবল স্বল্পতার কারণে সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব হয় না।

জানা যায়, নব্বই দশকের সময়ে ঢাকায় প্রায় ১১০টির বেশি মোড়ে (ইন্টারসেকশন) লাল-সবুজ বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল ছিল। এরপর সেটি ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যায়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শুরু হয় হাতের ইশারা। যা ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার আবারও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সড়কবাতি স্থাপনের নির্দেশ দেয়। প্রাথমিকভাবে হাইকোর্ট মোড় (কদম ফোয়ারা) থেকে উত্তরা আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত ২২টি ইন্টারসেকশনে এ সড়কবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সাতটি ইন্টারসেকশনে এ লাল-সবুজ বাতি বসানো হয়েছে। চলছে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cd435fd6230" ) );

আরও জানা যায়, এ প্রকল্পটিতে মূলত বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) প্রযুক্তিগত পরামর্শক হিসেবে, ডিটিসিএ (ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ) প্রকল্প ও সমন্বয়ের নেতৃত্বদাতা হিসেবে এবং সিটি করপোরেশন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রায়শই অন্যান্য সংস্থা যেমন ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ), বিআরটিএ এবং বিআরটিসি এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।

বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত সঠিক সময়ে সিগন্যাল পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। পাশাপাশি চালক ও পথচারী উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে প্রচার বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকেই শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে।’

এদিকে ডিটিসিএ নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। এখানে অনেকগুলো স্টেক হোল্ডার আছে। একেকটি সংস্থা একেকটা অংশ দেখছে। সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলের জন্য আরও উপযোগী ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) সুফিয়ান আহমেদ বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে লাল-সবুজ বাতির সংকেত অনেক কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। আমরা মনে করি, এখন বেশিরভাগ যানবাহন সংকেত মেনে চলাচল করছে। পর্যায়ক্রমে সবাই বিষয়টি মেনে নেবেন। যারা আইন অমান্য করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অথবা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হচ্ছে। পথচারীদের বিষয়েও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin