হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের স্ট্রং ভোল্ট থেকে আলোচিত ‘অস্ত্র চুরি’র ঘটনার আগেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। গত ২৪ অক্টোবর স্ট্রং রুমের তালা ভাঙা দেখার পর সব সংস্থার উপস্থিতিতে সেখানকার মালামাল পরিদর্শন শেষ করে পর দিন (২৫ অক্টোবর) নিরাপত্তা উদ্বেগ জানিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিমান। চিঠিতে নিরাপত্তা বাড়াতে অথবা মালামাল কাস্টমস হেফাজতে নেওয়ার কথা লিখিতভাবে জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বেবিচক চেয়ারম্যান ও কাস্টমস কমিশনার বরাবর চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ এই চিঠির বিষয়টি আমলে নেয়নি। নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে মূলত আলোচিত ‘অস্ত্র চুরি’র ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গেছে। যদিও এখনও বিষয়টি তদন্তাধীন। তবে চুরির বিষয়টি বিমানবন্দরে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব সংস্থা নিশ্চিত করেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে মন্ত্রণালয়কে দেওয়া বিমানের চিঠির কপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা বোসরা ইসলামও।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. সাফিকুর রহমান সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, কার্গো ভিলেজ এলাকায় আগুনে পুড়ে প্রায় সব মালামাল ভস্মীভূত হয়েছে। শুধুমাত্র স্ট্রং ভোল্টের মালামাল অক্ষত রয়েছে। যথাযথ নিয়ম পালন করেই এসব মালামালের পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে এসব মালামাল কাস্টমসের আওতাধীন রাখা যেতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২৪ অক্টোবর যখন আমরা তালা ভাঙা দেখতে পাই, তখন আমাদের কর্মকর্তাসহ বিমানবন্দরের অন্যান্য সংস্থাকে অবহিত করে তাদের উপস্থিতিতে মালামাল পরিদর্শন সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে আমাদের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ইস্যু চিন্তা করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে এবং কাস্টমস হেফাজতে রাখার বিষয়ে মতামত দেয়। অথচ বিষয়টি আমলেই নেওয়া হয়নি।’
জানা যায়, গত ২৮ অক্টোবর পুনরায় স্ট্রং রুমের সিলগালা তালা ভাঙা দেখতে পান বিমানের নিরাপত্তাকর্মীরা। এ সময় ওইসব কর্মকর্তাকে ডাকা হয়। তারা ভেতরে প্রবেশ করে অস্ত্রের কার্টনটি এলোমেলো দেখতে পান। সেখানে তাদের উপস্থিতিতে আবারও গণনা করে দেখা যায় আগের গণনার সঙ্গে মিল নেই। অর্থাৎ সেখানে ২১টি অস্ত্র থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ১৪টি। পরে ঘটনাস্থল থেকে তালা কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার এবং আলামত সংগ্রহ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল।
এদিকে ওই দিনই বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। জিডি দায়ের করেন বিমানের সহকারী ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মো. জামাল হোসেন। জিডিতে তিনি অস্ত্র চুরির কোনও বিষয় উল্লেখ করেননি।
জিডিতে মো. জামাল হোসেন উল্লেখ করেন, বিমানবন্দরের কার্গো আমদানি কমপ্লেক্সের স্ট্রং রুমের মালামাল ২৪ অক্টোবর বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার নেয়ামূল, বিমানের জিএম কার্গো নাজমুল হুদা, এনএসআই’র অতিরিক্ত পরিচালক ফিরোজ রব্বানীসহ অনেকের উপস্থিতিতে পরিদর্শন শেষ করা হয়। এরপর সব মালামাল ভল্টে রেখে সবার উপস্থিতিতে বিমান সিকিউরিটির প্রতিনিধির সইসহ শিকল দিয়ে তালা লাগিয়ে ভল্ট সিলগালা করা হয়। ২৭ অক্টোবর রাত ৯টা ৫০ মিনিটে পুলিশ সদস্য, আনসারসহ সর্বশেষ সিলগালা দেখে এসেছিলেন জামাল হোসেন। পর দিন সকাল ৭টা ৭ মিনিটের দিকে বিমান নিরাপত্তা শাখার ডিউটি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম খানের মাধ্যমে জানতে পারেন, স্ট্রং রুমের ভল্টের তালা লাগানো নেই। বিষয়টি ডিজিএম সিকিউরিটিকে জানালে বিমানবন্দরে আসেন তিনি। বিমান নিরাপত্তা ডিউটি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম খান ও ডিজিএম সিকিউরিটি উভয়ে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যসহ স্ট্রং রুমের ভল্টের কাছে গিয়ে দেখেন কোনও তালা লাগানো নেই।
২৮ অক্টোবর সকালে বিষয়টি নজরে এলেও শুরুতে গোপন রাখা হয়। যা প্রকাশ্যে আসে ২ নভেম্বর। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা সামনে আসার পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এত সুরক্ষিত স্থানে কীভাবে ঘটনাটি ঘটলো এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়।
তবে এ বিষয়ে বেবিচকের কোনও কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।