একেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে— আর তখন কারখানা মালিকের, কারখানা ভবন, কাজের পরিবেশ না থাকা, বা অনুমোদনের কাগজ না থাকা— কোনও না কোনও জটিলতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘বৈধতা না থাকা বা ঝুঁকির নোটিশ’এর কথাও শোনা যায়। প্রশ্ন হলো, যেকোনও ঝুঁকি যদি নজরে আসে, সেটা ঠিক করার জন্য কতদিন পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন, শক্ত আইন তৈরি না করলে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। দরকার আইনি কাঠামো ও জবাবদিহি।
২০২৩ সালে বঙ্গবাজারে আগুনের ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, ওই ঘটনার চার বছর আগেই অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন ফায়ার সার্ভিস থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে বেশ কিছু ব্যানারও টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সবাই জানতো, এই কমপ্লেক্স বড় ধরনের অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু এরপর সরকারের অন্য কোনও সংস্থা কিংবা বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের দোকান মালিকেরা অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধে কোনও ব্যবস্থা নেননি। ভয়াবহ আগুনে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সব দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর সরকারের কোনও সংস্থাই আর দায় নিতে চায়নি।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68efbb72a8f6e" ) );
২০১২ সালে তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর এক মাস পর সিআইডি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যে চার্জশিট জমা দিয়েছিল, তাতে উল্লেখ করা হয়— ‘তাজরীন ফ্যাশন্সের ৯ তলা ভবনে শ্রমিকদের জন্য কাজের পরিবেশ ছিল না।’ ওই চার্জশিট উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, “তাজরীন ফ্যাশন্সের সিঁড়িগুলো অপ্রশস্ত ছিল এবং মূল সড়ক থেকে কারখানা ছিল এক কিলোমিটার ভেতরে। সেখানে যাবার জন্য রাস্তাও ছিল সংকীর্ণ।” সেই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, সেখানে কারখানার মালিককে অভিযুক্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তাজরীন ট্র্যাজেডির এক বছর পর সাভারে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে জানা গেলো— রানা প্লাজা ভবনটি বৈধ ছিল না, ভবনের অনুমোদন ছিল না। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রানা প্লাজা ধসে ১১৩৫ জন নিহত এবং দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ২৯১ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এরা সবাই ওই ভবনের পাঁচটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে দুদক।
রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানার নিরাপত্তার দিকটি নজরে এলেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ভবনের নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ঢাকার বেইলি রোডে একটি ভবনে আগুনে অন্তত ৪৬ জনের প্রাণহানির পর আবার নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
দমকল বাহিনী সূত্রে জানা যায়, ঢাকার শতকরা ৫৫ ভাগ, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ভবন রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। এরমধ্যে রয়েছে সরকারি মালিকানায় থাকা বিভিন্ন ভবনও।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইটেনেন্স) লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা কোনও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিল গালা করতে পারি না। আইনে আমাদের সেই ক্ষমতা নাই। বার বার নোটিশ দেওয়ার পরও যখন ভবন মালিকরা আমলে না নেয়, তখন আমরা ভবনটি অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিশ টানিয়ে দিই। কিন্তু আমরা চলে আসার পর তারা তা ছিঁড়ে ফেলেন।”
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68efbb72a8fa8" ) );
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলম কেমিক্যাল নামে রাসায়নিক গোডাউনে আগুনের ঘটনা প্রসঙ্গে লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘ফায়ার সার্ভিস অবৈধ প্রতিষ্ঠানের যে তালিকা করেছে, সেখানে শাহ আলম ট্রেডার্স নামে ওই রাসায়নিকের গুদামটিও ছিল। অভিযান চালানোর পর্যায়ে ছিল গুদামটি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে জানানোর পাশাপাশি তিনবার ওই গুদামে নোটিশ দেওয়া হয়। গুদামটি অভিযান চালানোর পর্যায়ে ছিল।’’
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী সৈয়দ সুলতান উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, আইনের দুর্বলতা ও প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি না থাকার কারণে বারবার এধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ‘‘এগুলোর কোনোটাই দুর্ঘটনা নয়, এগুলো অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। আইনের সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত না হলে এধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না। কেননা, নিয়ম না মানলে মালিকের কী ক্ষতি হবে, এই বার্তা নেই।’’
কোনও ঝুঁকি সমস্যা চিহ্নিত হলে কতদিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘কোনও সমস্যা চিহ্নিত হলে সঙ্গে সঙ্গে সেই ভবন বন্ধ করে তারপর কাজ করতে হবে। শমিকের জীবনের প্রতি অবজ্ঞার কারণে আমরা বিষয়গুলো সিরিয়াসলি নেই না। আইন পরিবর্তন করতে হবে। কারণ ফায়ার সার্ভিসের এখতিয়ারে নেই অনেক কিছু।’’ শ্রম সংস্কার কমিশন এই জায়গায় কাজ করেছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘কমিশনের প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় চ্যাপ্টার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে। কিন্তু ৪ মাসের জেল আর ২ মাসের ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন না।’’
কারখানা ভবন, অবৈধ গোডাউন এসব নির্ধারণ হলে সেটা ঠিক করার জন্য কতদিন সময় দেওয়া হয়, জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী ফরিদ আহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সেটা কেস টু কেস ৭/১৫/১ মাস সময় বেঁধে নোটিশ দেওয়া হয়। এরমধ্যে তাদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। আমরা বন্ধ করতে পারি না, এই ক্ষমতা আইন আমাদের দেওয়া হয়নি।। নোটিশ দেওয়ার পরেও যদি আমাদের কথা না শোনে, তখন আমরা মামলার দিকে যাই।’’ কেন আইনে এই ক্ষমতা আজও দেওয়া হয়নি প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলে আইন বানায়, তারা সম্মিলিতভাবেই এটা চায় না বলে ক্ষমতা দেওয়া হয় না। তবে আইন পরিবর্তন জরুরি এবং অবশ্যই বিচার ও শাস্তির উদাহরণ তৈরি করতে হবে।’’