পাহাড়ের ঢালে সারি সারি সোনালি ধান। কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে সেই ধান কাটতে ব্যস্ত নারী-পুরুষের দল। কেউ ঝুঁকে ধান কাটছেন, কেউ ঝুড়িতে ভরে নিচ্ছেন সোনালি শিষ। কারও যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুমচাষিদের এমন ব্যস্ততা এখন প্রতিদিনের।
গতকাল শুক্রবার ও গত বৃহস্পতিবার জেলার দীঘিনালা, আলুটিলা, পানছড়ির মরাটিলা ও সদরের গাছবান এলাকায় জুমে (পাহাড়ি চাষের জমি) গিয়ে দেখা যায়, চারদিকের উৎসবের আমেজে ধান কাটা ও শুকানোর কাজ চলছে। পাহাড়ি নারীরা ধান কেটে জুম ঘরে (পাহাড়ের বিশেষ ঘর) এনে রাখছেন। আর পুরুষেরা এসব ধান গোলায় তুলছেন। বাতাস ভাসছে নতুন ধানের ম-ম গন্ধ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, এ বছর খাগড়াছড়ির জুমে ১৬ লাখ কেজির বেশি ধানের ফলন হয়েছে।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি তাঁরা পাহাড়ে আগাছা পরিষ্কার করেন। অর্থাৎ বৈশাখ মাসের শুরুতে বৃষ্টি হওয়ার পরপরই কাজ শুরু হয়। এরপর পাহাড়ের মাঝে তুলনামূলক সমান জায়গায় ধান চাষ করেন তাঁরা। এর সঙ্গে সারি সারি করে কোথাও কোথাও কলাগাছ আবার কোথাও মরিচ, হলুদ, আদা, বরবটি, বেগুন, শিম, মারফা, চিনাল, তিল, সাবারাং , ফুজি, লুমপোল (একধরনের মসলা), মিষ্টি কুমড়াসহ নানা ধরনের ফসল ও শাকসবজির বীজ বপন করেন। সেপ্টেম্বরে অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শুরুতে ধান পাকতে শুরু করে। ধান কাটা শেষ করার পর পর্যায়ক্রমে অন্য ফসলও তোলা শুরু হয়।
দীঘিনালা আট মাইল এলাকার চাষি অনিল ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বছর দুই একরের একটি পাহাড়ে জুমচাষ করেছি। অন্য বছরের চেয়ে তুলনামূলক বৃষ্টি কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। তবে পাখি অনেক ধান নষ্ট করছে। এ কারণে সব সময় এ ফসল পাহারায় রাখতে হচ্ছে।’
পানছড়ি মরাটিলা এলাকার আরেক চাষি প্রশান্ত ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর প্রায় তিন একর জুমের ধান ইতিমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ আট মাসের পরিশ্রমের ফল এখন হাতে পাচ্ছেন। এটা ভাবতেই তাঁরা আনন্দ লাগছে। মৌসম অনুকূলে থাকায় সব ধরনের ফসলই ভালো হয়েছে।
গাছবান এলাকার কৃষক মঙ্গলময় চাকমা বলেন, গত বছর তাঁর জুমের ফসল তেমন ভালো হয়নি। কিন্তু এ বছর ভালো ফলন হয়েছে। ধান ছাড়াও পাহাড়ি অন্য ফসলগুলোরও ফলন ভালো। বিশেষ করে চিনাল আর মারফা চাষে অনেকে লাভবান হবেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ধান চাষ হয়েছিল ১ হাজার ১২৪ হেক্টর জমিতে। সে বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ কেজি। এ বছর প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় এবার ১৬ লাখ কেজির বেশি উৎপাদন হবে বলে আশাবাদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের।
জানতে চাইলে অধিদপ্তরের উপপরিচালক বাছিরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আগের বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। যাঁরা আগে বীজ বপন করেছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে কাটা শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে এখন পাহাড়ে ফসল কাটার উৎসব চলছে।