বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া খেলাপি ঋণ নবায়নের নতুন সুবিধাকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য ‘ক্রেডিট নেগেটিভ’ বা ‘ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা মুডিস। সংস্থাটির মতে, এই নীতির ফলে ব্যাংকের ওপর চাপ সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়বে এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত মুডিসের প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
কী আছে নতুন প্রজ্ঞাপনে
১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে ঋণগ্রহীতাদের মাত্র ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিতে হবে। এরপর সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ শোধ করার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ শুরুর আগে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড সুবিধাও দেওয়া হবে। তবে ঋণ তিনবার বা তার বেশি পুনঃতফসিল করা হলে অতিরিক্ত এক শতাংশ অর্থ জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া নতুন সুবিধা নেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে চলমান মামলাও প্রত্যাহার করতে হবে।
মুডিসের আশঙ্কা
মুডিস বলছে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধক্ষমতা যাচাইয়ে বিলম্ব ঘটাবে, ফলে খেলাপি ঋণের হার কৃত্রিমভাবে কমে গেছে বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এতে সম্পদমানের ঝুঁকি আড়ালে থাকার শঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা ভবিষ্যতে ঋণ পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের জুলাইয়ে নিয়ম শিথিল করার পর ব্যাংক খাতে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতা বাড়লেও প্রকৃত পুনরুদ্ধার হয়নি। এবারও একই ঝুঁকি রয়েছে।
ব্যাংক খাতের চিত্র
মুডিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অনাদায়ি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক এক শতাংশে। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত নেমে এসেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে। অনাদায়ি ঋণের বিপরীতে সংরক্ষণও কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে।
দেশে চলতি বছরের জুন মাসের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি।
স্থিতিশীল তিন ব্যাংক
তবে মুডিস জানিয়েছে, তারা যে তিনটি ব্যাংকের ঋণমান নির্ধারণ করেছে— ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
ইতিবাচক দিকও দেখছে মুডিস
প্রতিবেদনে বলা হয়, ন্যূনতম সুদের হার থেকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার বিধান গ্রাহকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। এতে খেলাপির ক্ষেত্রে ব্যাংকের ক্ষতিও কিছুটা কমবে। তবে মাত্র ২ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধের শর্ত ব্যাংক খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করবে।