এইচএসসি ও সমমানের ফলাফল নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় হিসেবে কোনোভাবেই এই ফলাফলের দায় এড়াতে পারি না। এই ফলাফল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে সন্তুষ্টি নয়, বরং ন্যায্য নম্বর দিয়ে সততাকে বেছে নিয়েছি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলাম যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছিল।’
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় এ সময় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘ফলাফল মানে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি পরিবার, আশা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের গল্প। এ বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনেককে বিস্মিত করেছে। পাশের হার এবং জিপিএ–৫ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম এবং প্রশ্ন উঠেছে— কেন? এর উত্তর জটিল নয়, বরং সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর। বাংলাদেশে শেখার সংকট শুরু হয় খুব শুরুর দিকেই। প্রাথমিক সূত্র থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হয়। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছিল—পাসের হারই সাফল্যের প্রতীক, জিপিএ–৫–এর সংখ্যা ছিল তৃপ্তির মানদণ্ড। ফলাফল ‘ভালো’ দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি। আজ আমি সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। একজন দায়িত্বশীল উপদেষ্টা হিসেবে আমি চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা আবার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করুক। যে ফলাফল শিক্ষার্থীর শেখাকে সত্যিকারের মূল্যায়ন করে, সেটিই হোক আমাদের সাফল্যের মানদণ্ড।’
মূল্যায়ন ও ন্যায্যতার বিষয় তুলে ধরে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘এসএসসি ফলাফল প্রকাশের পর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যে উদ্বেগ উঠেছিল, আমি তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছি। আমি সকল শিক্ষা বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছি—যেন ভবিষ্যৎ পরীক্ষায়, বিশেষ করে এইচএসসি মূল্যায়নে, সীমান্তরেখায় থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতি সর্বোচ্চ ন্যায্যতা বজায় রাখা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে যেন ফলাফলের বাস্তবতা বিকৃত না হয়। আমরা ‘অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে সন্তুষ্টি’ নয়, বরং ‘ন্যায্য নম্বর দিয়ে সততা’কে বেছে নিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ আজ যদি আমরা সাহস করে বাস্তবতা স্বীকার না করি তাহলে মেধাবীদের প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি আমরা অন্যায় করব।’
দায়িত্ব ও আত্মসমালোচনা করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় হিসেবে আমরা কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়াতে পারি না। এবং এই মন্ত্রণালয়ের কর্ণধার হিসেবে আমার প্রথম দায়িত্ব হলো নিজেকে এবং আমাদের পুরো ব্যবস্থাকে মূল্যায়নের আওতায় আনা। এই ফলাফলকে আমি ব্যর্থতা নয়, বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখছি। আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি, যেখানে নিজেদের, শিক্ষাবোর্ড, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রে শেখার ভবিষ্যৎ নিয়ে সততার সঙ্গে কথা বলার সময় এসেছে।’
শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘শিক্ষাবিদ, গবেষক, ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করছি—যারা ডেটা বিশ্লেষণ করে শেখার মূল ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করবেন। আমাদের উদ্দেশ্য, অভিযোগ নয়, সমাধান খোঁজা। আমরা বোর্ডগুলোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যাচাই করার জন্য র্যান্ডম স্যাম্পল অডিট শুরু করছি। সীমান্তরেখায় থাকা স্ক্রিপ্টগুলো বেছে নিয়ে স্বাধীনভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।’
শিক্ষা উপদেষ্টা ইংরেজি ও গণিতে ব্রিজ কোর্স বা বুটক্যাম্প চালুর সম্ভাবনার অন্বেষণ এবং বাস্তবতা যাচাই করে এগোনোর কথা জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তিনটি নীতিতে এগোতে চাই, বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নয়, বাস্তবতাকে বুঝে এগোনো। দোষারোপ নয়, সমাধান খোঁজা। সংখ্যা নয়, শেখার মানকে সাফল্যের মাপকাঠি করা। এই ফলাফল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এটি হয়তো কষ্টের, কিন্তু এটি সত্যের দিকে ফেরার সূচনা। আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি। আমরা শুনছি। আমরা শিখছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই—একটি সৎ, জবাবদিহিমূলক, এবং শেখাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন করা, যেখানে প্রতিটি ফলাফলই হবে বাস্তব শেখার প্রতিফলন।’