সাপ্তাহিক কর্মদিবসে কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আর মালামাল খালাসের দায়িত্বে থাকা লোকজনের কোলাহলে মুখরিত থাকতো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা। কর্মব্যস্ততায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা দম ফেরানোর সময় পেতেন না। কিন্তু আজ রবিবার (১৯ অক্টোবর) সবার কাছে দিনটি যেন অচেনা। আগুনে কালচে দাগের দেয়াল অশ্রুসিক্ত চোখে দেখা ছাড়া যেন কারও কিছুই করার নেই। শনিবারের ভয়াবহ আগুনে কার্গো এলাকাজুড়ে এখন সুনসান নীরবতা।
সরেজমিন দেখা গেছে, কার্গো এলাকা বিশেষ করে ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেটে আসার সবদিকের রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেরিকেড। প্রতিষ্ঠানের কার্ডধারী ব্যক্তি ও সাংবাদিক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কার্ড দেখিয়ে বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট পেরিয়ে কার্গো বিল্ডিং চোখে পড়ে। বিল্ডিংয়ের সামনে লোকজনের জটলা। সামনে যেতেই দেখা যায়, তারা কোনও না কোনও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্মী। বিল্ডিংয়ের ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সামনে থেকে শুধু দেখা যায়, আগুনে পুড়ে সাদা রঙয়ের দেয়াল কালচে দাগ হয়ে আছে। যেন চেনার উপায় নেই– বিল্ডিংটি কর্মব্যস্ত হয়ে থাকতো, লোকজনের কোলাহলে থাকতো মুখরিত।
আরিফ নামে এক কর্মী জানান, আমাদের সব শেষ। অ্যাসেসমেন্ট, ট্যাক্স, ভ্যাট সব ওকে করা ছিল। বৃহস্পতিবার আমাদের গার্মেন্টস পণ্য ডেলিভারি হয়নি, আজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সব শেষ।
আরিফ ছাড়াও ইসমাইল, সাগর, নাজিম সবাই সিঅ্যান্ডএফ কর্মী। তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ– কবে চালু হবে কার্গো, কবে শুরু হবে কর্মব্যস্ততা।
নাজিম জানান, তাদের ইলেকট্রনিকস পণ্য ডেলিভারির অপেক্ষায় ছিল। আগুনে সব পুড়ে গেছে। ১০ হাজার ডলারের পণ্য ছিল বলেও জানান তিনি।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f4c93f8d43e" ) );
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে আনা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খালাসের দায়িত্বে ছিল মমতা ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির কাস্টমস কর্মকর্তা বিপ্লব হোসাইন জানান, ছয় দিন আগে রাশিয়া থেকে সাতটি শিপমেন্টে প্রায় ১৮ টন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম দেশে আসে। পণ্য খালাসের জন্য পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে এনওসি নিতে হয়। সেই অনুমতি নিতে দেরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খালাস করা সম্ভব হয়নি। আজ খালাস হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই পণ্যগুলো আগুনে পুড়ে গেছে।
পরিদর্শনে এসে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, মাসের আগে কার্গো পুরোপুরি চালু করা অসম্ভব।
প্রসঙ্গত, শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর সোয়া ২টায় বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট। একইসঙ্গে কাজ করেন নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, সিভিল অ্যাভিয়েশন, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, কার্গো ভিলেজটি সেখানকার পোস্ট অফিস ও বিমান রাখার হ্যাঙ্গারের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত। এটি বিমানবন্দরের আট নম্বর গেটের পাশের জায়গা। আর আগুন লেগেছে আমদানির কার্গো কমপ্লেক্স ভবনে। এখানে আমদানি করা পণ্য রাখা হয়। আগুনে এখানকার প্রায় সব মালামাল পুড়ে গেছে।
আগুনের কারণে বিমানবন্দরে সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে ঢাকার বদলে সব বিমান চট্টগ্রাম ও সিলেটে অবতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে, তিনটি ফ্লাইট সিলেটে, চেন্নাই ও দিল্লি থেকে দুটি ফ্লাইট কলকাতায় অবতরণ করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় রাত ৯টার পর উড়োজাহাজ ওঠানামা শুরু হয়। তবে ছয় ঘণ্টায় ২৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী।
আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার ফাইটার, সিভিল অ্যাভিয়েশন, আনসারসহ ৩৫ জন আহত হন। এর মধ্যে আনসার সদস্যই রয়েছেন ২৫ জন। তাদের সিএমএইচ ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাক কারখানার জন্য আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড় ও বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ ছিল আগুন লাগা ভবনে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি সময় লেগেছে। কবে নাগাদ ফের কার্গো ভিলেজ চালু করা যাবে তা পরে বলা যাবে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা।