দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিজমি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে আলাদা কর্তৃপক্ষ করবে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘বাংলাদেশ ভূমি জোনিং ও ভূমি সুরক্ষা’ কর্তৃপক্ষ নামে নতুন এই কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। সম্প্রতি ‘ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ১৯ আগস্ট খসড়াটি মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাদেশের খসড়ায় আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ভূমি জোনিং ও ভূমি সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ নামে সরকার একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করবে। তারা নিজ নামে সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও বিলি বন্দোবস্ত করতে পারবে। কর্তৃপক্ষ নিজ নামে মামলা দায়ের করতে পারবে এবং তাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা যাবে।
কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। তবে তারা প্রয়োজন মনে করলে সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশের যেকোনও স্থানে এর কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ ভূমি জোনিং ও ভূমি সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন না হওয়া পর্যন্ত ‘ভূমি সংস্কার বোর্ড’ কর্তৃপক্ষের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবে।
বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে কর্মরত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও সহকারী কমিশনারদের এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবেন।
অধ্যাদেশের খসড়ায় বলা হয়, কর্তৃপক্ষের প্রধান হবেন একজন চেয়ারম্যান। আর চার জন সদস্য নিয়ে এই কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। চেয়ারম্যান ও সদস্যরা থাকবেন কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক কর্মচারী। সরকার অন্যূন অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান এবং অন্যূন যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দুই জন সদস্য নিয়োগ করবে।
কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও কাজ
কর্তৃপক্ষ কৃষিজমি সুরক্ষা ও জোনভিত্তিক ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিতে সারা দেশে একইসঙ্গে বা পর্যায়ক্রমে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার বা মৌজার ভূমির বিদ্যমান ব্যবহার, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ভূমিরূপ যথাযথভাবে পরীক্ষা করে মৌজা, দাগ বা অন্য কোনও চিহ্ন দিয়ে ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ ও স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, ডাটাবেজ সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করবে।
কর্তৃপক্ষ ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে ভূমি সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে। দেশের মোট কৃষিজমির ন্যূনতম শতকরা ৮০ ভাগ শুধু কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে। মানুষের দ্বারা ভূমির উপরিভাগের ক্ষতিকর পরিবর্তন যথাসম্ভব রোধে ব্যবস্থা নেবে। ইটভাটা বা অন্য কোনও কাজে ব্যবহারের জন্য জমির উপরিভাগ, পাহাড়-টিলা কাটা ও মোচন রোধে প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশ দিতে পারবে।
এছাড়াও সব ধরনের অকৃষি জমি, জলাভূমি, জলাধার, নদ-নদী, খাল, হাওর, বাঁওড়, বিল, পাহাড়, টিলা, বনভূমি প্রভৃতির ক্ষতিকর পরিবর্তন রোধে প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
কোনও ব্যক্তি ভূমি জোনিং ম্যাপে কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত জমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ, কোনও স্থাপনা বা ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করলে কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওই স্থাপনা বা ভৌত অবকাঠামো অপসারণের আদেশ দিতে পারবে।
অনুমোদন ছাড়া ভূমির জোনের শ্রেণি পরিবর্তন করলে আগের শ্রেণিতে ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষ আদেশ দিতে পারবে। এমনকি অপরাধ সংঘটনের উপকরণ ও আলামত জব্দ এবং বাজেয়াপ্ত করে ভূমি নিলাম বিক্রিসহ যথোপযুক্ত বিলি বন্দোবস্ত করতে পারবে।
কৃষিজমি সুরক্ষা
‘ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুযায়ী কৃষিজমি সুরক্ষা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০(১৯৫১ সালের ২৮নং আইন)’-এর ৮৩ ধারায় যাই থাকুক না কেন এই আইনের অধীনে সংজ্ঞায়িত সব কৃষিজমি সুরক্ষা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না বা শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। তবে অকৃষি বা অন্য কোনও শ্রেণির ভূমি কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনও বাধা থাকবে না।
দুই বা তার বেশি ফসলি কৃষিজমি কোনও অবস্থাতেই কৃষি ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। এক ফসলি ভূমিকেও কৃষিজমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব, জনস্বার্থ বিবেচনায় ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিমাণ এক ফসলি কৃষিজমি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা স্থাপন বা কৃষি সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা অন্য কোনও বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
কোনও ব্যক্তি ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভূমি ব্যবহার করে নিজ কৃষিজমিতে বসতবাড়ি, উপাসনালয়, কবরস্থান, সমাধি, গুদামঘর, পারিবারিক ব্যবহারের জন্য পুকুর, দোকানপাট, কুটির শিল্পসহ বসতবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবেন। তবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমির বেশি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করতে পারবেন না। জমির ব্যবহারভিত্তিক সর্বোচ্চ সিলিং বিধি দ্বারা নির্ধারণ করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
বিশেষ কৃষি অঞ্চল ঘোষণা
আইনের খসড়ায় বলা হয়, বন, জলাভূমি, নদী, পাহাড় ও টিলা শ্রেণি এবং সাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি এসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্যান্য আইনের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে ভূমি জোনিং ম্যাপ অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা সাপেক্ষ সরকার দেশের কোনও অঞ্চল বা এলাকাকে বিশেষ কৃষি অঞ্চল হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারবে।
জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন অনুবিভাগ) মো. আব্দুর রউফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভূমির ব্যবহার এবং কৃষিজমি সুরক্ষার উদ্বেগ আছে। এটি দীর্ঘদিনের চিন্তা। সেদিক থেকে সরকারের এটি উদ্যোগ। আমরা একটি খসড়া করেছি। বিভিন্ন মতামত আসবে, চূড়ান্ত করে ক্যাবিনেটে যাবে।’
কবে নাগাদ অধ্যাদেশটি সম্পন্ন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে মাসখানেকের মধ্যে ক্যাবিনেটে যাবে।’