লেক ভিউ গার্ডেনের দুই ফুল

লেক ভিউ গার্ডেনের দুই ফুল

কত দিন হলো শরতের নরম আলো গায়ে মাখি না! কখন শিউলি ফুটে টুপটাপ ঝরে যায়, দেখা হয় না সেসব। ছাতিমের গন্ধমাখা রাতগুলো ইদানীং যেন রূপকথার গল্পের মতোই হয়ে উঠেছে। হেলে পড়া টান টান বিকেলের মৃদু বাতাসে শরতের গন্ধ পাই না অনেক দিন। শরতের ঝলমলে সকালে গোলাপি সূর্যের আলোমাখা স্থলপদ্মের মায়াবী রঙের কথা মনে পড়ে। ছেলেবেলায় বাড়ির উঠানে ছড়িয়ে থাকা বাগানে ছিল এই ফুল। প্রিয় সেই মুহূর্তগুলো এখন চাইলেও আর ফিরে আসবে না। প্রকৃতিবিমুখ এই শহরে এসব দুরাশা মাত্র। কিন্তু মন তো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। প্রতিটি ঋতুর রং, রূপ, গন্ধ পেতে ব্যাকুল।

মনের খোরাক জোগাতেই মাঝেমধ্যে বিবর্ণ এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও পাড়ি জমাই। এবার মন চাইছে খুব পাহাড়ে যেতে। পাহাড়ে কারণে–অকারণে কতবার যে যাই। রাতের নির্জন পাহাড়ি পথে ছুটে চলে গাড়ি। চেনা এই পথ। ৩৭ বছর ধরে যাতায়াত। খানিকটা দূরে দূরে পাহাড়ি বাজার, দোকানপাট, বিক্ষিপ্ত জনপদ। অবশেষে ক্লান্তিহীন ভ্রমণ শেষে রাঙামাটি শহরে পৌঁছে যাই।

প্রিয় এই শৈল-শহরে স্বাগত জানালেন বৃক্ষপ্রেমী ও প্রকৌশলী সবুজ চাকমা। এবার মূলত তাঁর আমন্ত্রণেই এখানে আসা। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আমাদের প্রথম গন্তব্য লেক ভিউ গার্ডেন। বাগানটি দেখার জন্য তিনি বছরখানেক আগেই বলেছিলেন। লেকের ওপর প্রায় ৬০ বছর আগে তৈরি হওয়া ৬৬৩ মিটার দীর্ঘ বাঁধের ধার ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে এই নাগরিক উদ্যান। আশি ও নব্বইয়ের দশকে এই বাঁধে ছিল সুদৃশ্য কৃষ্ণচূড়ার বীথি। ফুলের মৌসুমে এখানে অসাধারণ এক দৃশ্য দেখা যেত।

উদ্যানটি বেশ চওড়া না হলেও মোটামুটি দীর্ঘ। কয়েকটি ধাপে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সবুজ চাকমা বাগানের নকশাগুলো দেখালেন। বাগানটি ল্যান্ডস্কেপ রীতির হওয়ায় এখানে মূলত গুল্মশ্রেণির ফুলের গাছগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রায় বর্ষব্যাপ্ত ফুলের উজ্জ্বল রংগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে। রোপণ করা গাছগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আমরা। এর মধ্যে দুটি ফুল নজর কাড়ল। একটির ইংরেজি নামের অর্থ ‘কমলা রঙের কাঞ্চন’। অন্যটির নাম ঘাসফুল, নিসর্গী দ্বিজেন শর্মার দেওয়া নাম। দুটি ফুলই আমাদের দেশে আবাদিত। সুদর্শন এই ফুল দুটির পরিচয় জানা যাক।

কমলা রঙের কাঞ্চন

ইংরেজি নাম অরেঞ্জ বাউহিনিয়া, ককস বাউহিনিয়া ইত্যাদি। গাছটি (Phanera kockiana) সম্প্রতি এসেছে আমাদের দেশে। প্রথম দেখি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণদিয়া গ্রামের ‘গাছবাড়ি’তে। এটি চিরসবুজ বা আধা-পর্ণমোচী কাষ্ঠল লতার গাছ। কাণ্ড প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। ছোট ছোট ডালপালা ও ঘনবদ্ধ পাতায় বেশ ঝোপাল হয়ে ওঠে। বহুবর্ণিল ফুল এবং নান্দনিক গড়নের পাতার জন্য গাছটি বেশ আকর্ষণীয় ও মনলোভা। পাতা কাণ্ড বরাবর পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে। ডিম্বাকৃতি থেকে উপবৃত্তাকার আকৃতির এবং গোড়া থেকে পাতার শীর্ষ পর্যন্ত তিনটি স্পষ্ট শিরা থাকে। সাধারণত ৭ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার প্রশস্ত এবং চকচকে সবুজ। একসময় এই উদ্ভিদ বাউহিনিয়া কক্কিয়ানা অর্থাৎ কাঞ্চন নামে শনাক্ত করা হলেও কাঞ্চনের পাতার সঙ্গে এ গাছের কোনো সাদৃশ্য নেই।

ফুল শাখা-প্রশাখা এবং পার্শ্বীয় প্রান্তে ফোটে। পাপড়ির ৫টি লতি দেখতে নখের মতো। ফুল দীর্ঘ সরু ভিত্তিসহ ২ থেকে আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা, ডিম্বাকার প্রান্ত তরঙ্গায়িত, রং হলুদ থেকে কমলা-লাল রঙে রূপান্তরিত হয়। ফুলগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় গাছে একই সঙ্গে হলুদ ও কমলা রঙের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। গাছে একই সময়ে দুই রঙের সহাবস্থানের কারণে ফুল বেশ বর্ণাঢ্য দেখায়। এ কারণে ফুলটি বেশ জনপ্রিয়।

ঘাসফুল

সাধারণভাবে আমরা ঘাসফুল বলতে যা বুঝি, এই ফুল ঠিক সে রকম নয়। এদের রীতিমতো লালন-পালন করতে হয়। মূলত বাগানের শোভাবর্ধনের জন্যই এ ফুলের চাষ। সাদা, গোলাপি ও হলুদ রঙের ফুল দিয়ে সুবিন্যস্ত বেড বানানো যায়। এরা (Zaphyranthes spp.) দক্ষিণ আমেরিকার প্রজাতি। সারা পৃথিবীতে রেইন লিলি নামেও পরিচিত।

গাছ ১ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বৃদ্ধি মন্থর। গাছ মাটির নিচের কন্দ থেকে গজায়। গোড়ায় সবুজ রঙের একগুচ্ছ পাতা থাকে, দেখতে লম্বা ঘাসের মতো। মাঝখান থেকে গজানো প্রায় ২০ সেন্টিমিটার লম্বা মঞ্জরিদণ্ডের আগায় গন্ধহীন একক ফুল ফোটে। তিন রঙের ফুলের মধ্যে ক্যানডিডা সাদা, রোজা গোলাপি এবং সালফুরিয়া হলুদ। গ্রীষ্ম থেকে শরৎ অবধি ফুল ফোটার মৌসুম। প্রস্ফুটিত ফুল সন্ধ্যায় বুজে যায়।

মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

Comments

0 total

Be the first to comment.

রাজধানীসহ কয়েক স্থানে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, থাকতে পারে কয় দিন জানাল আবহাওয়া অফিস Prothomalo | পরিবেশ

রাজধানীসহ কয়েক স্থানে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, থাকতে পারে কয় দিন জানাল আবহাওয়া অফিস

দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল শনিবার রাত থেকেই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃষ্টি...

Sep 14, 2025

More from this User

View all posts by admin