লন্ডনের হাইড পার্কে কুকুরের চোখে যেন নিখাদ সুখ

লন্ডনের হাইড পার্কে কুকুরের চোখে যেন নিখাদ সুখ

লন্ডনের হাইড পার্কে সকাল-বিকেল বেশ জনসমাগম ঘটে। কেউ হাঁটে, কেউ দৌড়ায় কেউবা বেঞ্চে বসে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন। নরম ঘাসের ওপর পায়ের শব্দ, দূরে কারও সাইকেলের হুইসেল, আর তার মাঝখানে দেখা মেলে একঝাঁক কুকুরের। কেউ লাফাচ্ছে, কেউ ঘাসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, আবার কেউ মাটির গন্ধ শুঁকে একেবারে নিজের জগতে মগ্ন। আর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে কয়েকজন মানুষ। কারো কারো কাছে পাঁচ ছয়টাও কুকুর থাকে।

প্রথমে ভেবেছিলাম, আশপাশের অভিজাত এলাকা হওয়ায় একজনের চার-পাঁচটা কুকুর থাকতেই পারে। কিন্তু এখনকার বাসাগুলোর ভেতর দেখে মনে হয় না যে এক বাসায় এতগুলো কুকুর থাকতে পারে। বিষয়টা নিয়ে বেশ কৌতূহল জাগে আমার। কেনসিংটন এলাকায় কর্মরত এক বাঙালির কাছে কৌতূহল শরণাপন্ন হই।

আচ্ছা ভাই, বলেনতো এখানে এক বাসায় কি এতগুলো কুকুর থাকতে পারে?, ‘এতগুলো মানে?’ ভদ্রলোক উল্টা প্রশ্ন ছুড়ে মারে। ‘মানে চার-পাঁচটার মতো তো দেখি একেক জনের সাথে।’ বলে একটু অপ্রতীব হয়ে যাই। ‘ও, আচ্ছা, আপনি প্রফেশনাল ডক ওয়াকারদের কথা বলছেন?’। প্রফেশনাল ডগওয়াকার মানে? একটু গবেষণা করে দেখি!

হাইড পার্কে সকাল বিকেল বেশকিছু ডগওয়াকারদের দেখা মেলে। এরা প্রফেশনাল ওয়াকার। এক হাতে তিনটে, অন্য হাতে আরেকটা—তবুও কী অদ্ভুত ভারসাম্য তারা ধরে রাখে! সকাল-বেলার শীতল কুয়াশার ভেতর দিয়ে যখন তারা এক সারি কুকুর নিয়ে হাঁটে, মনে হয় যেন ছোট্ট এক শোভাযাত্রা চলছে।

কুকুরগুলোর চোখে যেমন উত্তেজনা, তেমনি ডগ ওয়াকারদের মুখেও থাকে প্রশান্তি। এরা শুধু হাঁটায় না, মাঝে মধ্যে থেমে বলও ছুড়ে দেয়, কুকুরকে মুক্ত করে দৌড়াতে দেয়। তখন হাইড পার্কের সবুজ মাঠ ভরে যায় ঘেউ ঘেউ শব্দ আর আনন্দের উল্লাসে।তাদের এই কাজ নিছক ভালোবাসা হলেও, পারিশ্রমিকও আছে। প্রতি ঘণ্টার হিসেব চলে—গড়ে ১৫ পাউন্ডের মতো।

কারও যদি একসাথে পাঁচটা কুকুর থাকে, তবে আয়ের অঙ্কটাও বেড়ে যায়। কেউ একা কাজ করে, আবার কেউ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। Tailster, Wag! বা Rover—এসব নাম লন্ডনের কুকুরপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। এই কোম্পানিগুলো শুধু ডগ ওয়াকারদের বুকিং-ই করে না, বরং মালিক আর কুকুর দুপক্ষের নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা দেয়।

কিন্তু এসব হিসেব-নিকেশের বাইরে, হাইড পার্কে দাঁড়িয়ে তাকালে মনে হবে ডগ ওয়াকাররা আসলে শহরের এক টুকরো প্রাণচাঞ্চল্য বহন করে বেড়ায়। তাদের সঙ্গে কুকুরদের হাসি, দৌড়, আর বাতাসে উড়ে আসা আনন্দ যেন পুরো পার্কটাকে ভরে তোলে।

কুকুরের চোখে ভাসে এক ধরনের নিখাদ সুখ, আর সেই সুখেই ডগ ওয়াকারদের দিনের শুরু হয়। টাকা হয়তো প্রয়োজনীয়, কিন্তু হাইড পার্কের সকালের নরম আলোয় তারা যে হাসি খুঁজে পায়, সেটাই হয়তো তাদের আসল প্রাপ্তি।

এমআরএম/এমএস

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin