মালদ্বীপের পার্লামেন্টে নিজেদের একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নতুন একটি বিল অনুমোদন করিয়েছে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সরকার। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হওয়া নতুন ওই বিলের কারণে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকস্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
দেশটির বৃহত্তম সাংবাদিক সংগঠন মালদ্বীপ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এমজেএ) ওই আইনের বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠনের তরফ থেকে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুকে বিলটিতে ভেটো দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এমজেএ–এর মহাসচিব আহমেদ নাঈফ বলেন, এই আইন মূলত অনলাইন এবং অফলাইনে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হবে। এভাবে সংবাদমাধ্যমকে কার্যত নির্বাহী শাখার অধীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা সাংবাদিকরা এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ জানাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মুইজ্জুর সরকার বলছে, বিতর্কিত এই ‘মালদ্বীপ মিডিয়া অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং রেগুলেশন বিল’ অনুমোদনের উদ্দেশ্য কেবলই সম্প্রচার ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম তদারকির জন্য একটি একক সংস্থা গড়ে তোলা। সংবিধানে সুরক্ষিত বাকস্বাধীনতা রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য বলে সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লা খলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের ওপর এ আইন প্রযোজ্য হবে না। এটি কেবল ভুয়া ও অপতথ্যের বিভ্রান্তি মোকাবিলার জন্য একটি স্পষ্ট মানদণ্ড স্থাপন করবে।
মুইজ্জুর দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেস (পিএনসি) ও এর মিত্ররা বর্তমানে পিপলস মজলিসে (পার্লামেন্ট) ৯৩টি আসনের মধ্যে ৭৯টি নিয়ন্ত্রণ করছে। মঙ্গলবার একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকে তারা বিলটি পাশ করে। ডেপুটি স্পিকার আহমেদ নাজিম পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে সব প্রতিবাদ উপেক্ষা তো করেনই, উল্টো বিরোধী দলের সাত সদস্যকে বের করে দিয়ে ভোট সম্পন্ন করেন।
মালদ্বীপে ২০০৮ সালে একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে। এরপর থেকেই পাঁচ লাখ মানুষের দেশটিতে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার সংগ্রাম চলছে। সম্প্রতি, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর শাসনামলে কিছু পরিবর্তন নিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন বিশ্লেষকরা। যেমন, প্রেসিডেন্ট ঘনিষ্ঠদের মদদে সর্বোচ্চ আদালতে এক বিচারপতির সাময়িক বরখাস্তকরণ ও দুজনের অপসারণের ঘটনায় সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, ঘটনাগুলো ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
আলোচ্য বিলে সাত সদস্যের একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব আছে। তিনজন হবে পার্লামেন্ট মনোনীত এবং নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যম সংস্থাগুলো বাকিদের নির্বাচিত করবে। তবে সব সদস্যকেই পার্লামেন্ট চাইলে অপসারণ করতে পারবে।
প্রস্তাবিত কমিশনকে সংবাদমাধ্যমের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরানোর যথেষ্ট এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। যদি কোনও সংবাদ কমিশনের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার পরিপন্থি মনে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চাইলেই তারা জরিমানা, কার্যক্রম স্থগিত এমনকি বন্ধই করে দিতে পারবে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cb81393af5c" ) );
আগের খসড়ায় কমিশনের তিন সদস্যকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেবেন বলা ছিল, যা পরে বদলানো হয়েছে। তবু এমজেএ–এর মহাসচিব নাঈফের মতে, পার্লামেন্ট যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গুলিহেলনে চলে, তাই প্রকৃতপক্ষে সংবাদমাধ্যমকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের অধীনেই আনা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, আমাদের দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আমরা স্ব-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার তা না করে একটি রাজনৈতিক কমিশনের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এই বিল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য না, আনা হয়েছে সাংবাদিকদের শায়েস্তা করার জন্য।
বিলের আরেকটি ধারা অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমকেও প্রচলিত মাধ্যমের মতো নিয়মের অধীনে আনা হবে। নাঈফের মতে, এটি অনলাইনে কনটেন্ট প্রকাশ করা ব্যক্তিদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে এবং ইন্টারনেট সেন্সরশিপের নতুন মাত্রা তৈরি করবে।
সরকার অবশ্য জোর দিয়ে বলছে, এই আইন শুধু নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রযোজ্য হবে। যুবমন্ত্রী এবং একজন সাবেক সাংবাদিক ইব্রাহিম ওয়াহিদ বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে যে সব তরুণ কন্টেন্ট তৈরি করেন, তারা এই আইনের আওতায় পড়ে না। এটি কেবল নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য।
‘গণতন্ত্রের জন্য কালো দিন’
বিরোধী রাজনৈতিক দল মালদ্বীপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এমডিপি) বিলটিকে গণতন্ত্রের জন্য কালো দিন বলে উল্লেখ করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ বলেছেন, যেভাবে গোপনে বিলটি পাস হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা প্রমাণ করে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লা শহীদও অভিযোগ করেছেন যে সরকার মুক্ত মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
মার্কিন দূতাবাস বিলটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, মুইজ্জুর সরকারকে অবশ্যই বিরোধী ও ভিন্নমতসহ সবার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। মালদ্বীপ বার কাউন্সিলও প্রেসিডেন্টকে বিলটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে, যেন এটি সাংবিধানিক নীতি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই বিল স্বাধীন সাংবাদিকদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সংবাদমাধ্যমকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনবে। বিলটি প্রত্যাখ্যান এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি পালন করতে আমরা প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুকে আহ্বান জানাই।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা