ভারতের রাজনীতিতে কি পরিবর্তনের ঢেউ এসেছে? গত কয়েক সপ্তাহে ভারতের দুই প্রান্তে দুটি নতুন রাজনীতিবিদের আবির্ভাব হয়েছে। এই দুইজন নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি স্বেচ্ছাচারী ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী বলে আক্রমণ করছেন। শুধু তাই নয়, লাখো মানুষ তাদের কথা শুনছেন। তাদের কথা শুনতে কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় করছেন। আর তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেনজি’র একটা বিরাট অংশ এই দুজনকে ঘিরে নতুন স্বপ্নও বুনতে শুরু করেছে।
এদের একজন হলেন ভারতের সর্ব দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাডুর সুপারস্টার অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া থালাপতি বিজয়। আর অপরজন ভারতের উত্তরের রাজ্য লাদাখের সুপরিচিত পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী তথা মানবাধিকারকর্মী সোনাম ওয়াংচুক!
লাদাখে গত সপ্তাহে জেন জি’র বিক্ষোভ, সহিংসতা ও প্রাণহানির পর সোনাম ওয়াংচুককে কঠোর সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) কারুর জেলায় থালাপতি বিজয়ের জনসভায় পদপিষ্ট হয়ে ৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকে গুঞ্জন উঠেছে দক্ষিণী সিনেমার এই নায়ককেও যে কোনেও সময় আটক করা হতে পারে।
দেশের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের এই দুইরনেতা যে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই!
৫১ বছর বয়সি থালাপতি বিজয় বর্তমানে তামিল সিনেমা ছেড়ে গত বছর রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। তার নতুন দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) রাজ্য রাজনীতিতে এরইমধ্যে ঝড় তুলেছে।
তামিলনাডুতে সিনেমার তারকাদের রাজনীতিতে আসা অবশ্য নতুন কোনও ঘটনা নয় – হাতের কাছে এমজিআর, কমল হাসন, বিজয়কান্তের মতো অজস্র উদাহরণ আছে। তবে রজনীকান্তের মতো সুপারস্টার বহুদিন দোলাচলে ভোগার পর অবশেষে রাজনীতি থেকে দূরেই থাকবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন বছরকয়েক আগে।
তামিল রাজনীতির বর্ষীয়ান পর্যবেক্ষক ইলাঙ্গোভান রাজাশেখরন বলছিলেন, ‘রজনীকান্তের ছেড়ে যাওয়া স্পেসটাই আসলে থালাপতি বিজয় এলাম-দেখলাম-জয় করলাম কায়দায় দখল করে নিয়েছেন। বিগত সাত দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনীতি দুটো দল – ডিএমকে আর এআইডিএমকে’র কব্জায়। বিজেপি বা কংগ্রেসের মতো জাতীয় স্তরের দলগুলো এখানে ছোট মাঠের খেলোয়াড়, তারা বড় দলগুলোর হাত ধরেই রাজনীতি করে। বিজয়ের দল এখন দ্রাবিড় রাজনীতির এই বাইনারিটাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।’
মাসদেড়েক আগে দলের জনসভা থেকে থালাপতি বিজয় এই দুই দ্রাবিড় দলকে আক্রমণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্দেশ্যেও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করেছেন ‘আপনি কি মানুষের জন্য কাজ করতে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, নাকি সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলা করতে?’
মোদিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি আরও বলেন – তামিলনাডুর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচিতিকে আক্রমণ করলে তার ফল ভাল হবে না।
বিজয়ের সেই সব মন্তব্য নিয়ে তখন বিতর্ক হয়েছিল বিস্তর। তামিলনাডু এমন একটি রাজ্য যেখানে বিজেপি বহুদিন ধরে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রাণপাত করছে। তামিলনাডুতে বিধানসভা ভোট আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাস নাগাদ। সেই ভোটে শাসক ডিএমকে’র বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে এআইডিএমকে, যাদের জোটসঙ্গী হতে চলেছে বিজেপি।
কিন্তু থালাপতি বিজয় রাজ্যে বিজেপির সেই অঙ্কটাকেই আপাতত প্রবল প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন – যে কারণে দক্ষিণ ভারতে তিনিই এখন মোদির সবচেয়ে বড় শির:পীড়ার নাম!
এদিকে থ্রি ইডিয়টস মুভিতে আমির খানের চরিত্রটি যার আদলে তৈরি করা হয়েছিল, লাদাখের সেই মানবাধিকার কর্মী সোনাম ওয়াংচুককে সারাদেশ চিনেছে ওই সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই।
কিন্তু তারও বহু আগে থেকে তিনি লাদাখের জন্য অসাধারণ সব কাজ করে আসছেন। প্রচণ্ড শীতে সেনাবাহিনীর থাকার জন্য সৌরশক্তিতে আলোকিত ও উষ্ণায়িত আরামদায়ক আবাসন পর্যন্ত তৈরি করেছেন। অভিনব বরফস্তূপ তৈরি করে লাদাখের জলকষ্ট পর্যন্ত মিটিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠিত এনজিও ‘সেকমল’ লাদাখের শিক্ষাখাতেও যুগান্তকারী নানা কাজ করেছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68de66be1527d" ) );
২০১৯ সালের ৫ই আগস্ট যখন নরেন্দ্র মোদি সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে জম্মু ও কাশ্মিরের (লাদাখ তখন ওই রাজ্যের অংশ ছিল) বিশেষ স্বীকৃতি বাতিল করে এবং কাশ্মির ও লাদাখকে দুটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে তখন সোনাম ওয়াংচুক সেই সিদ্ধান্তকেও সর্বতোভাবে সমর্থন করেছিলেন।
তবে লাদাখের অধিকার আদায়ের দাবিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানী লেহতে যে অনশন আন্দোলন শুরু হয় তাতেও শামিল হয়েছিলেন তিনি। যদিও পরে আন্দোলন সহিংস আকার নেওয়ায় এবং অন্তত চারজনের প্রাণহানি হওয়ায় প্রতিবাদে অনশন ভেঙে আন্দোলন থেকে সরে আসেন তিনি ।
কিন্তু এর পরেও তার গ্রেফতার ঠেকানো যায়নি। তবে এই গ্রেফতারের কারণে তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।
এরই মধ্যে ভারতজুড়ে ‘হ্যাশট্যাগ ইন্ডিয়াস্ট্যান্ডসউইথসোনামওয়াংচুক’ বার্তার মধ্যে দিয়ে লাখ লাখ ভারতবাসী জানাচ্ছেন, এই লড়াইতে তারা সোনামের পাশেই আছেন!