মেহেরপুরে ২৪০ টাকায় পুলিশে চাকরি পেলেন ভ্যানচালকের ছেলে

মেহেরপুরে ২৪০ টাকায় পুলিশে চাকরি পেলেন ভ্যানচালকের ছেলে

মেহেরপুরে পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষায় যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়ে জেলার সাধারণ পরিবারে বয়ে গেছে খুশির জোয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে পুলিশে নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ থাকলেও এবারের নিয়োগ ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ।

মাত্র ২৪০ টাকা খরচ করে ৯ জন যুবক চাকরি পেয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল পদে। তাদের মধ্যে আছেন ভ্যানচালক, কৃষক, দিনমজুর পরিবারের সন্তানেরা। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রমাণ করেছে—সত্যিকারের যোগ্যতা থাকলেই সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

মেহেরপুর মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান গ্রামের ভ্যানচালক মিন্টু মোল্লার পরিবারের খুশি এখন সবার মুখে মুখে। তার ছেলে মাজহারুল ইসলাম পুলিশের চাকরি পেয়েছেন। শুক্রবার সকাল থেকে মিন্টু মোল্লা অপেক্ষা করছিলেন পুলিশ লাইনের মূল ফটকের সামনে। কিছুক্ষণ পর ছেলে দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনের চোখে-মুখে ঝলমল করছিল গর্ব আর আনন্দ।

মিন্টু মোল্লা জানান, তিনি সারাজীবন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালিয়েছেন। সেই ভ্যানেই ছেলে মাজহারুলকে স্কুলে নিয়ে গেছেন। কখনো ভেবেও দেখেননি, তার ছেলে একদিন পুলিশের চাকরি পাবে। তিনি বলেন, আমার জীবনের কষ্ট বৃথা যায়নি। আজকের এই দিন দেখার জন্যই এতদিন পরিশ্রম করেছি।

মাজহারুল বলেন, মাত্র ২৪০ টাকা খরচ করে চাকরি পেয়েছি। এখন থেকে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেব। প্রথম বেতন হাতে পেলে সেই টাকা বাবার হাতে তুলে দেব। বাবাই আমাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাই বাবার সাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে চাই সারাজীবন।

মেহেরপুর শহরের দিঘীরপাড়ার কৃষক আক্কাস আলীর ছেলে রুমমানও চাকরি পেয়ে উচ্ছ্বসিত। রুমমান বলেন, তাদের পরিবার অভাব-অনটনে দিন কাটিয়েছে। বাবার সীমিত আয়ে সংসার চালানোই কঠিন ছিল। এখন চাকরি পাওয়ার পর পরিবারের কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে।

তিনি জানান, পুলিশে চাকরি করা আমার স্বপ্ন ছিল। পরিবারের কষ্ট কমাতে চাই। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবার সেই সুযোগ এসেছে। এখন কঠোর পরিশ্রম করে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করব।

শুধু মাজহারুল বা রুমমান নয়, এবারের নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত ৯ জন যুবকের গল্প প্রায় একই রকম। কারো বাবা দিনমজুর, কারো বাবা কৃষক। অনটন, কষ্ট আর সংগ্রামের মাঝেই তারা বড় হয়েছেন। তাদের সবার অভিন্ন বক্তব্য—টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়নি, যোগ্যতার মাধ্যমেই তারা চাকরি পেয়েছেন।

আরেক সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল অমিত হাসান জানান, আগে চাকরি পেতে ঘুষ লাগত এমন অভিযোগ ছিল প্রচুর। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়া সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। এতে যোগ্য তরুণরা উৎসাহিত হয়েছেন।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ছাড়াই যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা কেবল যোগ্যতা আর মেধাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। এজন্যই সাধারণ পরিবার থেকে আসা ছেলে-মেয়েরা চাকরি পেয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা অর্জন করা। সেই আস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া।

মোট ৫৫৫ জন প্রার্থী এবারের কনস্টেবল পদে আবেদন করেছিলেন। লিখিত, মৌখিক, শারীরিক ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেন তারা। সবশেষে যোগ্য বিবেচিত হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই মেহেরপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ।

আসিফ ইকবাল/এমআরএম

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin