মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড বারবার নষ্ট হচ্ছে কেন?

মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড বারবার নষ্ট হচ্ছে কেন?

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তখন এই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল প্রায় ১১ ঘণ্টা। এরপর গতকাল রবিবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় আবারও বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান আবুল কালাম আজাদ নামের এক যুবক।

এ ঘটনার পর নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মেট্রো ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিয়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেও একই জায়গায় বিয়ারিং প্যাড খুলে গিয়েছিল। তখন প্রকৌশলী ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য নকশাগত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করেছিলেন।

দুইবারই বিয়ারিং প্যাড খুলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে মেট্রোরেল লাইনের একটি বাঁক অংশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল লাইনের বাঁকে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে এবং সেখানেই প্যাডটি খসে পড়েছে। নকশাগত ত্রুটি এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

বুয়েটের সাবেক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহসানুল কবির ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেট্রোরেল লাইনের বাঁকা অংশে চাপ বেশি পড়ে, ফলে প্যাডটি সেখান থেকে খসে পড়ে থাকতে পারে। আর মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাডগুলো সঠিকভাবে সংযুক্ত নয়, ফলে একই স্থানে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে।’

ড. আহসানুল কবির আরও বলেন, ‘বাঁকানো অংশে ইন্সটলেশনের মান নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।’

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বিয়ারিং প্যাডের প্রযুক্তিগত ভূমিকা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বিয়ারিং প্যাড ট্রেনের ওজনের চাপ পেলে সামান্য চেপে যায় এবং ট্রেন চলে গেলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু যদি ভায়াডাক্ট (উঁচু রেলপথ) আগের অবস্থায় না ফেরে, তাহলে বোঝা যায় বিয়ারিং প্যাড হয় অকেজো হয়েছে, নয়তো খুলে পড়েছে।’

তিনি সতর্ক করেন, নষ্ট বিয়ারিং প্যাড ভায়াডাক্টের জয়েন্ট ও সাপোর্ট পিলারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান ইন্সটলেশনের আগে কঠোর পরীক্ষার ওপর জোর দেন এবং ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ইন্সটলেশনের আগে কঠোর পরীক্ষা, কারণ অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।’

বিয়ারিং প্যাডের ভূমিকা

বিয়ারিং প্যাড মেট্রোরেল কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ভায়াডাক্ট ও কলামের (স্তম্ভ) মাঝখানে বসানো হয়, যাতে কম্পন শোষণ, ভার বহন এবং কাঠামোর নমনীয়তা বজায় থাকে। এই প্যাডগুলো কেবল ট্রেনের ওজনই বহন করে না, বরং ট্রেন চলার সময় সৃষ্ট কম্পনও শোষণ করে। রেললাইনের বাঁকানো অংশে এর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে পাশের ও নিচের দিকে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এই অংশ নষ্ট হলে কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়- যাত্রী ও পথচারী উভয়ের জন্যই।

সরকারি তদন্ত ও সুপারিশ

দুর্ঘটনার পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। এ কমিটিতে থাকছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, ডিএমটিসিএল-এর লাইন-৫-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। উপ-সচিব আসফিয়া সুলতানা কমিটিতে সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

এই কমিটিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁকানো স্থানে বিয়ারিং প্যাড স্থাপন আরও নিরাপদ করতে উন্নত প্রযুক্তি ও ধাতব-সংবলিত বা চাপ-সহনশীল উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এছাড়া, অস্বাভাবিক নড়াচড়া শনাক্ত করতে মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন, বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সার্টিফিকেশন, রক্ষণাবেক্ষণ নীতি ও বীমা কভারেজ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin