মিথ বনাম বাস্তবতা: বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ

মিথ বনাম বাস্তবতা: বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে বিশ্ব ইতোমধ্যেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৮০% কর্মসংস্থানে মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা এবং আইসিটি দক্ষতা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে।  তবে যখন নারীদে এসটিইএম খাতে (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত) অংশগ্রহণের ব্যাপারটি গভীরভাবে দেখা হয়, তখন বৈষম্যগুলো স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। প্রকৌশল ও আইসিটি সম্পর্কিত পেশায় বর্তমানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব পুরুষদের তুলনায় অত্যন্ত কম। বিশ্বব্যাপী এসটিইএম খাতকে ধরেই নেওয়া হয়ে থাকে পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবে। বাংলাদেশেও একই রকম পরিস্থিতি দেখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে মেয়েদের খুব কমই স্কুলে পাঠানো হতো, আর  বিজ্ঞানকে ছেলেদের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। ফলে অনেক মেয়ে বড় হয়ে বিশ্বাস করত যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাত তাদের জন্য নয়। এই ধারণা আজও অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান, বিশেষ করে যখন নারীদের সমান অংশগ্রহণ এর কথা আসে।

আইএমএফ এর তথ্যমতে, প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্বস্থানীয় পদে কাজ করার ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের ১৫% কম সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, কেরানি বা সেবামূলক পদগুলোতে নারীদের কাজ করার সম্ভাবনা পুরুষদের তুলনায় ১৯% বেশি থাকে, যেখানে নতুন প্রযুক্তির কারণে চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি বিষয়ে  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী প্রকৌশল  স্নাতকদের মধ্যে মাত্র ২০% নারী রয়েছেন, প্রকৌশল পেশাজীবীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ২% এরও কম। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মাত্র ১৯% আইসিটি বিশেষজ্ঞ এবং এক-তৃতীয়াংশ এসটিইএম স্নাতক নারী রয়েছেন। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে গবেষকদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২৩.৯%, যেখানে এই ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ২৯.৩%।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ef27fbeef11" ) );

এই অংশগ্রহণের অভাব এবং সামাজিক স্টেরিওটাইপ এর কারণে এই ব্যাপারটিকে প্রায়শই এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, নারীরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে পুরুষদের তুলনায় কম আগ্রহী অথবা কম দক্ষ। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটি অত্যন্ত ভিন্ন। নারীদের এই কম অংশগ্রহণের সমস্যা আজকের নয়; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীদের এই ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন চলে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়াটসন এবং ক্রিক বিখ্যাত ডিএনএ মডেলটি তৈরি করেছিলেন যেখানে তারা নিজেদের গবেষণালব্ধ তথ্যের পাশাপাশি এক নারী বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্রান্কলিন এর গবেষণায় প্রাপ্ত ডিএনএ অণুর একটি অপ্রকাশিত এক্স-রে ডিফ্রাকশন চিত্র ব্যবহার করেছিলেন। ফ্রান্কলিন এর এই অবদান তার মৃত্যুর আগে স্বীকৃত হয়নি। ঠিক এভাবেই, যুগে যুগে নারীরা সামাজিক স্টেরিওটাইপ, বৈষম্য এবং অসহযোগিতার কারণে এই খাতে পিছিয়ে গেছেন। আজও এসটিইএম খাতে কর্মরত নারীরা  বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন।

বাস্তব চিত্র: নারীদের এসটিইএম-এ কম অংশগ্রহণ তাদের অনাগ্রহ নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার ফল

গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী, শিক্ষাগত অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশ ১৪৬ দেশের মধ্যে ১২২তম স্থানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে নারী ও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আফগানিস্তান, নেপাল ও পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করা মেয়েদের সংখ্যা বেশি, কেবল ৮% মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে এবং মাত্র ১.৫% উচ্চতর শিক্ষায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগে ভর্তি হয়ে থাকেন। বাংলাদেশে এসটিইএম খাতে  লিঙ্গ বৈষম্য রয়েছে প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, ডিজিটাল স্বাক্ষরতা থেকে শুরু করে  বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতের পেশায় প্রতিনিধিত্ব পর্যন্ত। জিএসএম-এর ২০২২ মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ১৯% নারী মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩৬%। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি জেন্ডার অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এসটিইএম পেশাজীবীদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি মাত্র ১৪%। আইটি খাতে নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম; কেবল ১৫% নারী সিনিয়র পদে, ১% নারী আইটি কোম্পানির মালিক এবং মাত্র ২% নারী আইটি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। নারীদের এই খাতে অন্তর্ভুক্তি ব্যাহত হওয়ার প্রধান কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রাথমিক শিক্ষায় সামাজিক স্টেরিওটাইপ ও পক্ষপাতিত্ব: কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের এসটিইএম বিষয়গুলোতে প্রায়ই নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। ছেলেরা বিজ্ঞানে মেয়েদের চেয়ে ভালো, এই পক্ষপাতমূলক ধারণা মেয়েদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে তাদের মাঝে বিজ্ঞান শিক্ষা ও এ বিষয়ক কর্মজীবন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই ধারণাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে বিদ্যমান। যেমন; এসটিইএম-নিস্ট চায়নার তথ্যমতে:

“মেয়েদের মাঝে মাঝে বলা হয় যে, মাধ্যমিক পর্যায়ে কোনও মেয়ে বিজ্ঞানে ভালো করলেও হাই স্কুলে সেই অগ্রাধিকার ধরে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে যাবে; কিন্তু যদি কোনো ছেলে খারাপ ফলাফলও করে, সেটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়, কারণ সে এখনো ছোট, এবং হাই স্কুলে উঠলে ঠিক হয়ে যাবে। যদিও শহরাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই প্রচলিত ট্যাগ এবং পক্ষপাতদুষ্ট সংস্কৃতি এখনো মেয়েদের ওপর প্রভাব ফেলে।”

শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য: প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের বিজ্ঞান শিক্ষায় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। দক্ষ শিক্ষক, অবকাঠামো ও সম্পদের অভাব ছাড়াও এসব স্কুলে উন্নত কোর্স বা এসটিইএম সম্পর্কিত সহপাঠ কার্যক্রমের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই বৈষম্য এবং  প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যার উপস্থিতি মেয়েদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা ও দক্ষতা তৈরির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষার বিনিয়োগের ফলপ্রসূতা: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে পড়াশোনা শেষ করার পরে নারীরা চাকরিতে প্রবেশের পর বেতন, সুবিধা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের দিক থেকে পুরুষদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে থাকেন। শিক্ষায় পুরুষদের সমান বিনিয়োগ করলেও নারীরা এর ফলাফল তুলনামূলকভাবে কম পেয়ে থাকেন, যা এসটিইএম ক্যারিয়ার নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিরুৎসাহিত করে।

ক্যারিয়ার সম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতা: নিয়োগের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, পর্যাপ্ত ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স এর অভাব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশায় নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রচলিত ধ্যান ধারনার  চাপে নারীরা এসটিইএম খাতের পেশা গ্রহণ করা থেকে প্রায়ই পিছিয়ে যান। এছাড়াও, উচ্চশিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে  নারীরা যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হন, যা এই খাতে তাদের ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।

সামাজিক স্টেরিওটাইপ ও সহযোগিতার অভাব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নারীদের জন্য যথাযথ সহযোগিতার অভাব। যেমন: পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টার ও মাতৃত্বকালীন সুবিধার অভাবে প্রায়শই নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরে সমস্যার সম্মুখীন হন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতও এর বাইরে নয়। এছাড়াও সামাজিকভাবে শিশু পালন, ঘরের কাজ ও পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেয়ার কাজগুলোকে আজও শুধু নারীদের কাজ হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে। এ কারণে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মতো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে নারীদের একদম ছোট বয়স থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ef27fbeef4d" ) );

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির অভাবের অর্থনীতি ও আয়ের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। ইউএন উইমেন-এর  জেন্ডার স্ন্যাপশট ২০২২ রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীদের ডিজিটাল ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জিডিপি থেকে গত এক দশকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার এর ক্ষতি হয়েছে। তবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে বর্তমানে নারীরা ক্রমশই এসটিইএম সম্পর্কিত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে এবং উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তাই বর্তমান সময়ে তাদের কম অংশগ্রহণ দক্ষতার ঘাটতি বা অনাগ্রহের প্রতিফলন নয়। বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণেই নারীরা এখনো এই খাতে পিছিয়ে আছেন। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস ও দক্ষ, বৈচিত্র্যময় জনশক্তি  তৈরির পাশাপাশি, নারীদের এসটিইএম -এ অন্তর্ভুক্ত করতে বিনিয়োগ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। মেয়েদের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা, মেন্টরশিপ ও ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা এবং নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে যাতে নারীদের এসটিইএম সম্পর্কিত পেশায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নিয়োগ ও রিটেনশন এর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সামাজিক স্টেরিওটাইপ দূরীকরণে সকল ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি। তাই মিথ নয়, বরং  যথাযথ নীতিগত পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতাই পারে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং এর মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

ইউথ পলিসি ফোরাম ও ‘অধিকার এখানে, এখনই’ প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি চতুর্থ পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন-https://ypfbd.org/ypfrhrn/

Comments

0 total

Be the first to comment.

মাইক্রোসফটের সঙ্গে চুক্তি: ওপেনএআই’র বাজারমূল্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার BanglaTribune | তথ্যপ্রযুক্তি

মাইক্রোসফটের সঙ্গে চুক্তি: ওপেনএআই’র বাজারমূল্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এখন আর শুধু অলাভজনক সংস্থা নয়—এবার তার...

Oct 29, 2025
মেসেজ থেকে কল—সব এক চশমায়! BanglaTribune | তথ্যপ্রযুক্তি

মেসেজ থেকে কল—সব এক চশমায়!

প্রযুক্তির নতুন যুগে প্রবেশ করছে স্মার্ট গ্লাস। মেটা সম্প্রতি উন্মোচন করেছে রে-ব্যান ডিসপ্লে। এতে চশ...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin