নান্দনিক হাতিরঝিল এখন ‘মরণফাঁদ’

নান্দনিক হাতিরঝিল এখন ‘মরণফাঁদ’

ঢাকার অন্যতম নান্দনিক প্রকল্প হাতিরঝিলের সড়ক যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে খানাখন্দে ভরে ওঠা সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ব্যাপক হারে বেড়েছে। সাড়ে সাত কিলোমিটার একমুখী চলাচলের এই সড়কগুলোতে পানি জমে থাকায় গর্তগুলো অনেক সময়ই চালকের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘটছে মারাত্মক সব দুর্ঘটনা।

রাজউকের তত্ত্বাবধানে ২০১৩ সালে উদ্বোধন হওয়া হাতিরঝিল প্রকল্প এক সময় নগর উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সম্প্রতি ঢাকা ট্রিবিউনের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পুরো এলাকায় অন্তত ১১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত তৈরি রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া এলাকায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের অ্যাসফল্ট আবরণ ক্ষয়ে গিয়ে পাথর বেরিয়ে পড়েছে, অনেক স্থানের গর্তে পানি জমে রাস্তা ভয়াবহভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এফডিসি এলাকার প্রবেশপথে খানাখন্দ সামান্য হলেও সামনে যেতে যেতে সেগুলো অনেক জায়গায় বিশাল আকার ধারণ করেছে।

দুর্ঘটনা হ্রাসে স্থানীয়দের উদ্যোগ

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সজিব বলেন, ‘বছরের পর বছর এই রাস্তাগুলো মেরামত হয়নি। এখন চালক আর দোকানিরা নিজেরাই গর্ত ভরাট করছেন। আর লেকের পানি এখন প্রচণ্ড দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে, চারপাশ ভরে গেছে আবর্জনা ও আগাছায়। এছাড়া রাস্তার অধিকাংশ লাইট চুরি হয়ে যাওয়ায় রাতে বাড়ছে চুরি-ছিনতাই।

হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটার, পুলিশ প্লাজা, দক্ষিণ বাড্ডা ও রামপুরা অংশে গর্তের কারণে যানবাহন অনেক সময় আচমকা ব্রেক করতে হয়। তাই হাতিরঝিলে চালকরা এখন অতি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালান।

প্রাইভেটকার চালক আখতার হোসেন বলেন, ‘আগের চেয়ে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সড়কের বেহাল দশার কারণে গাড়ির নিচের অংশ রাস্তায় আটকে যায়। আবার একটু ভুল হলেই চাকা গর্তে আটকে পড়ে।’

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f21f45424d3" ) );

মোটরসাইকেলচালক সাইফুল বলেন, ‘আমার এক বন্ধু গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় এসব গর্ত ঠিকমতো দেখা যায় না। (বাড়তি সাবধানতার কারণে) ১৫ মিনিটের রাস্তা এখন যেতে আধাঘণ্টা সময় লাগে।’

মাইক্রোবাসচালক ওসমান গনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেই দেখলাম, মোটরসাইকেলের চাকা এক গর্তে ফেঁসে যাওয়ায় চালক ও আরোহী মারাত্মক আহত হন।’

খানাখন্দের কারণে এক মোটরসাইকেলচালক আরেকটু হলেই প্রাণ হারাতেন বলে জানান কুনিপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবিদ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই রাস্তাগুলো এক সময় কত সুন্দর ছিল, এখন সব ভাঙাচোরা।’

রাজউকের অব্যবস্থাপনা

হাতিরঝিল প্রকল্প তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, মগবাজার ও কাওরানবাজারকে সংযুক্ত করে। প্রথমে সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করলেও পরে দায়িত্ব হস্তান্তর হয় রাজউকের কাছে। তখন থেকেই অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বাড়তে থাকে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী তৌফিক সিকদার বলেন, ‘সেনাবাহিনীর হাতে প্রকল্পটা পরিপাটি ছিল। রাজউক আসার পরই যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়েছে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের বড় প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট অপরিহার্য। বাজেট না থাকলে স্থায়িত্ব আসবে না।’

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিনিধির পর্যবেক্ষণে পাওয়া গেছে, রাজউকের হাতিরঝিল অফিসের সামনের রাস্তারও বেহাল দশা। সামান্য বৃষ্টিতেই অফিস ভবনের সামনে হাঁটুপানি জমে যায়। ভবনের ভেতরের সিঁড়িতে কুকুর ঘুমিয়ে থাকে। রিসেপশনে কোনো মানুষকেও দেখা যায়নি। ভবনটি মূলত গাড়ি পার্কিং ও গ্যারেজ ভাড়ায় ব্যবহৃত হয়, শুধু একতলা রাজউকের মিটিংয়ের জন্য সংরক্ষিত।

অফিস সহকারী মোহাম্মদ শাহাদাত জানান, এখানে নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ হয় না। কর্মকর্তারা মতিঝিল অফিস থেকেই কাজ করেন।

রাজউকের বক্তব্য

হাতিরঝিলে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ স্বীকার করেছেন রাজউকের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মজাফর উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় মেরামত বিলম্বিত হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব শ্রমিক দল নেই।’

টেন্ডার সম্পন্ন হলে দুই-তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। জানান, সেনাবাহিনীর তুলনায় রাজউকের কাজ সাশ্রয়ী। এছাড়া, তারা জনবল বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছেন।

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষাকালে রাস্তা সংস্কারের কাজ নেওয়া সম্ভব নয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে, বর্ষা শেষে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার শুরু হবে।’

হাতিরঝিলে নিরাপত্তা সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, ‘চুরি-ছিনতাই মূলত আশপাশের বস্তি এলাকা থেকে হচ্ছে। পুলিশকে জানিয়েছি, দ্রুতই এর সমাধান হবে।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin