মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের আন্তঃসম্পর্ককে স্বীকার করে টেকসই ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকারে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হলো বিশ্ব ‘ওয়ান হেলথ দিবস ২০২৫’।
আইসিডিডিআর,বি, বাংলাদেশ সরকার, ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েট এবং ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গবেষক ও বিশেষজ্ঞসহ দুই শতাধিক অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল “ওয়ান হেলথ: একটি নিরাপদ বিশ্বের জন্য একসাথে”, যা মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে এক অভিন্ন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রক্ষার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজন করা হয় মূল উপস্থাপনা, পোস্টার প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণী, এবং “ওয়ান হেলথ ইন অ্যাকশন” শীর্ষক প্যানেল আলোচনা, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে ওয়ান হেলথ উদ্যোগের সফল প্রয়োগ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে বলেন,“ওয়ান হেলথ এখন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশসহ উন্নত দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদের সুযোগ দিচ্ছে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নির্ধারণের, যা দেশের কল্যাণে কাজ করবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরী এবং পশুসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন আইসিডিডিআর,বি-র সায়েন্টিস্ট ড. সুকান্ত চৌধুরী, এবং সভাপতিত্ব করেন আইইডিসিআর-এর পরিচালক ড. তাহমিনা শিরিন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক প্রফেসর ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনা। তিনি বলেন,“ওয়ান হেলথ আন্দোলন জনস্বাস্থ্যের প্রাথমিক পথিকৃৎদের হাত ধরে শুরু হয়ে এখন মহামারি প্রস্তুতি ও টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। এই যাত্রা আইসিডিডিআর,বি থেকেই শুরু, এবং আজ তারা এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জুনোটিক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো হুমকিগুলো আলাদা করে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়—সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এর সমাধান।”
বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরী বলেন,“আমরা আমাদের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছি। তাই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে—নাহলে ভবিষ্যতে বড় বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।”
পশুসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান বলেন,“ওয়ান হেলথ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী সমন্বয় ও জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট গঠন জরুরি।”
সভাপতির বক্তব্যে ড. তাহমিনা শিরিন বলেন,“ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি। রোগ সার্ভেইল্যান্সে আইসিডিডিআর,বি এবং অংশীদারদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।”
প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা জুনোটিক রোগ, বার্ড ফ্লু, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, টিকাদান কৌশল এবং প্রাণী কল্যাণ বিষয়ে করণীয় কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন।
এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত দশটি পোস্টারের মধ্যে সেরা তিনটি দলকে পুরস্কৃত করা হয়।
প্রতিবছর ৩ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত ‘ওয়ান হেলথ দিবস’ মানুষ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্কের প্রতি সচেতনতা বাড়ায়। ওয়ান হেলথ পদ্ধতি সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধ, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজকরা।