নির্বাচন সামনে রেখে আসছে অস্ত্র, নেপথ্যে প্রতিবেশী দুই দেশ

নির্বাচন সামনে রেখে আসছে অস্ত্র, নেপথ্যে প্রতিবেশী দুই দেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের পক্ষ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ঘোষণার পর থেকে দেশে নানা ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন বানচাল করতে একটি পক্ষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম আনা হচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ নির্বাচন বানচালে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে। গোয়েন্দাদের ধারণা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাই মূলত এ ধরনের নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যার একটি প্রমাণ মিলেছে গত ২৬ অক্টোবর।

ওই দিন দুপুরে রাজধানী বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে অভিযান চালিয়ে ৮টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় পাঁচ কেজি বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। অভিযানের বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বর্ডার ক্রস করে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক আসছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর একটি দল বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালায়। এ সময় একটি বগি থেকে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬ রাউন্ড গুলি, ২.৩৮৭ কেজি গান পাউডার এবং ২.২২৮ কেজি প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। এসব গান পাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক দিয়ে মূলত ককটেল ও হাতবোমা তৈরি করা হয়।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নির্বাচন বানচালের নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার জন্য দেশকে অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে সরকারে বিভিন্ন উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যেও এমন আভাস উঠে আসছে। গত ২৯ অক্টোবর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যমুনায় প্রথম সমন্বয় সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, ‘ছোট শক্তি নয়, বড় শক্তি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘হঠাৎ আক্রমণ চলে আসতে পারে। এই নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। যত ঝড়-ঝঞ্ঝাই আসুক না কেন, আমাদের সেটা অতিক্রম করতে হবে।’

সূত্র বলছে, গত বছর ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তার সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রী এবং নেতাকর্মীরা সেই দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে থেকে আওয়ামী লীগের নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার আশঙ্কা, ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশে একটি বড় ধরনের শোডাউনের পরিকল্পনা করছে। মূলত নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য তারা বিভিন্নভাবে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এখনও এক হাজার ৩৪২টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে একই সময়ে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭২১টি উদ্ধার করা হলেও এখনও ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৭টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে।

এদিকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে এসএমজির মতো প্রাণঘাতী অস্ত্রসহ রাইফেল, মর্টারশেল, পিস্তল, গুলি ও ভয়ংকর বিস্ফোরক চোরাচালানের মাধ্যমে সীমান্তপথে দেশে আসছে। এর কিছু অংশ ধরা পড়লেও বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। অন্যদিকে পুরস্কার ঘোষণা করেও জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে এখনও ২৫ শতাংশ উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিএমপির তথ্য বলছে, গত তিন মাসে রাজধানীতে অন্তত দুই শতাধিক জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ঘটেছে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ অঙ্গসংগঠনের অন্তত তিন হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ককটেল, বিস্ফোরক ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মাধ্যমে কক্সবাজার ও টেকনাফ দিয়ে দেশে অস্ত্র আসছে। এসব অস্ত্র আনার পেছনে রয়েছে রোহিঙ্গা চক্রের সদস্যরা। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে যেভাবে অস্ত্র ঢুকছে এরকম পরিস্থিতি কয়েক বছর আগেও ছিল না। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের সাতটি পথে পাচারকারীরা অস্ত্র আনছে।

এদিকে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) থেকে জানানো হয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ১১৪টি অস্ত্র, এক হাজার ৭২৫ রাউন্ড গুলি, ৩৯টি ম্যাগাজিন, ৯টি মর্টারশেল ও ১১টি গ্রেনেড জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি এসএমজি, ১২টি রাইফেল, ২টি রিভলভার, ৩৬টি পিস্তল এবং অন্যান্য অস্ত্র ৬২টি।

জানা যায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত সাতটি পথে অবৈধ অস্ত্রের চালান নিয়মিতভাবে দেশে ঢুকছে। এই অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত রয়েছে অন্তত পাঁচটি সংঘবদ্ধ চক্র, যার প্রতিটিতেই কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সীমান্ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এসব অস্ত্রের মূল গন্তব্য কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সন্ত্রাসীদের আস্তানা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমার থেকে যেভাবে অস্ত্র প্রবেশ করছে, এমন পরিস্থিতি গত কয়েক বছরেও দেখা যায়নি। এখন মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রও যুক্ত হয়েছে অস্ত্র ব্যবসায়, ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কক্সবাজারের রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে কিছু অস্ত্র প্রবেশের চেষ্টা হচ্ছে, তবে সেটির পরিমাণ এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, ‘বিজিবি অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং গত তিন মাসে ২২টির বেশি দেশি-বিদেশি অস্ত্রের চালান আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশে প্রবেশের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু নির্বাচনি পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা নয়, বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক ধরনের ষড়যন্ত্র।’

তিনি বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ক্ষমতার রূপান্তরের সময়কে লক্ষ্য করে কিছু গোষ্ঠী সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র ও বিস্ফোরক ঢোকানোর চেষ্টা করেছে। এ ধরনের প্রবণতা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা।’

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘নির্বাচন কেন্দ্র করে যেকোনও ধরনের নাশকতা ঠেকাতে এখনই কঠোর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাব ও পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন থাকতে হবে, যেন দেশের নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোনও বিদেশি স্বার্থের বলি না হয়।’

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত আছে। যেকোনও ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড, নাশকতা বা সংঘর্ষের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin