বাংলাদেশের আপামর-সাধারণের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই লালন সঙ্গীত এবং ফরিদা পারভীন পরস্পর পরিপূরক এবং অবিচ্ছিন্ন দু’টি নাম। লালন সাঁইজির গানের প্রসঙ্গ উঠলেই বাঙালীর মন-কানে প্রথমেই যার কণ্ঠস্বর ও সুর বেজে ওঠে তা নিশ্চিতভাবেই ফরিদা পারভীনের। দীর্ঘদিন তিনি দূর কুষ্টিয়া শহরে বসে লালন সঙ্গীতের চর্চা করেছেন এবং সেখান থেকেই তাঁর প্রতিষ্ঠা। দূর মফস্বল শহরে বাস করে লালন সঙ্গীতের মতো একটি বিশেষ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে একক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে ফরিদা পারভীন ব্যতীত আর কারো নেই। কুষ্টিয়াতে অবস্থানকালেই তিনি লালন সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক এবং ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিতে ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটি গেয়ে ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। বর্তমান এই শিল্পী সঙ্গীতকে আঁকড়ে ধরে ঢাকাতে অবস্থান করছেন।
ফরিদা পারভীনের জন্ম ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার কলম গ্রাম সংলগ্ন শাঔঁলে। ফরিদা পারভীন বলেন—কলম গ্রামের মতো এত সুন্দর এবং বড় গ্রাম নাকি তামাম উত্তরবঙ্গে নেই। ‘বিল দেখতে চলন। গ্রাম দেখতে কলম।’ সেই সুন্দর গ্রামাঞ্চলে কেমন কেটেছে তার ছেলেবেলা? ‘ছোটবেলায় আমি একটু চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম। দৌড়-ঝাঁপ, খেলাধুলা এইসব করে বেড়াতাম। ছোট ছোট ডিঙিতে চড়ে বিলে শাপলা তুলতে যেতাম। পাখির বাসা দেখে বেড়াতাম।’
এই দুরন্তপনার ফাঁকেই মাতৃস্তন্য পান করতে করতে তাঁর অন্তরে আসন গেড়ে বসেছিল সুর। ‘আমি কিন্তু অনেক বড় হয়ে আমার মায়ের দুধ খেয়েছি। এক মেয়ে ছিলাম, ঘুম পাড়ানোর সময় মার দুধ খেতাম, আর মা গান করত। মায়ের সেই সুরটাই আমার ভেতর রয়ে গেছে, সেই সুরটা এখনো আমি ভুলতে পারি না। তখনকার হিন্দি গান, লতাজির অনেক গান মা গাইত। সিনেমা দেখত তো খুব, তখনকার সিনেমার ওইসব গান গাইত। আমার মায়ের কিন্তু খুব ভালো গানের গলা ছিল।’
ছোটবেলাকার গানের স্মৃতি মন্থন করে ফরিদা পারভীন আরো বললেন,—‘আমি পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। যে কারণে মামা-খালারা আমাকে খুব বেশি ভালবাসতো। তারপর আমি আবার একটু একটু গান জানি।...আমার বড় মামা ভীষণ গানের ভক্ত ছিলেন। উনি গান করতেন না, কিন্তু গানের আসর যেখানে, সেখানে উনি যাবেনই। হয়তো নানার বাড়িতে গেছি, সন্ধ্যার পর উঠানে পাটি পেড়ে গান হত। আমার গান শুনে বড় মামা বলত, “আমার ফরিদার মতো আর গলা দেখি না। দেখিস রৌফা (আমার মা তো সবার ছোট, মায়ের নাম ধরে বলত) আমার ফরিদা যা হবে না।”’
গানের পাশাপাশি লেখাপড়াও চলেছে সমানতালে। নাটোরের জগৎপুর, শাঁঔলের স্কুলেই। বাবা দেলোয়ার হোসেন মেডিকেলে চাকরি করতেন। বদলির চাকরি। ‘একবার গ্রামে, একবার বাবার চাকরিস্থলে আমার জীবন চলেছে।’ এরমধ্যেই মাগুরায় প্রথম গানের হাতেখড়ি হয়ে গেল।
ছোটবেলায় কি নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে গান করতেন? ‘না,তেমন কিছু নয়’ হেসে বললেন—‘গানের সুর আমার ভেতরে সব সময়ই ছিল। খেলা করছি, পড়ছি...পড়তে পড়তে একটা গান মনে এল, ব্যস, জোরে জোরে গাইতে শুরু করলাম।’
পড়ালেখার মন বিশেষ না থাকলেও পরীক্ষার ফলাফল কিন্তু ভালো ছিল। ‘মাগুরায় যখন পড়ি, ওয়ান থেকে টুতে উঠছি, তখন এক মার্কের জন্য আমাকে সেকেন্ড করে দিল। তারপর আমার সে কী কান্নাকাটি। কান্নাকাটি করে বললাম যে, আমি পড়বই না।’
গানের ক্ষেত্রে এই জেদটা কীভাবে কাজ করেছে? ফরিদা পারভীন হেসে বলেন,—‘তাহলে, আরেকটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা বলি। তখনো মাগুরায় থাকি। বাবার সঙ্গে জেদ করছি আমার হারমোনিয়াম বানিয়ে দাও, আমি হাতেখড়ি দেব, আমি গান শিখব। মাগুরায় আমরা তখন ভাড়া বাসায় থাকি, পাশেই আরো দু-একজন ভাড়াটিয়া আছে। তাদের একজনার বাসায় হারমোনিয়াম আছে, অথচ আমার হারমোনিয়াম নেই, বোঝেন অবস্থা!...
‘আমাদের বাসা থেকে ওই বাসায় যেতে একটা উঠোন মতো আছে, সেখানে জাংলা দিয়ে শিমের গাছ আছে, ওর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একদিন রাতের বেলা ওই বাসায় হারমোনিয়ামের বাজনা শুনে আমি ছুটে দৌড় মারছি, তারপর আমি গিয়ে ওদের কিছুই বলছি না, আমি ওই দরজার কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছি, হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে। আমার ভেতরে ভেতরে রাগ হচ্ছে।
‘ওই ঘটনার পর আমার আব্বাকে বললাম, “আমি পড়বও না, খাবও না, গোসল করব না, কিছু করব না, আমার হারমোনিয়াম যদি না বানিয়ে দাও।”’
তারপর হারমোনিয়ামের সবকিছু কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হলো। নিয়ে এসে বাসায় মিস্ত্রি দিয়ে হারমোনিয়াম তৈরি করা হলো। সেই হারমোনিয়ামটাই এখনো আছে। ‘আমার মা যত্ন করে নেপথলিন দিয়ে রেখে দিয়েছে। আমি গেলে আবার একটু বের করে, মা যদি গান শুনতে চায়, তখন শোনাই।
‘যুদ্ধের বছরে শুধু হারমোনিয়ামটা-ই নিয়ে গিয়েছিলাম, আর কিছুই নিইনি। হারমোনিয়ামটা মিলিটারি দেখলে আমাকে হয়তো রেডিওতে গান করতে নিয়ে যাবে— এই ভয়ে হারমোনিয়ামটা এক সময় মাটির নিচে পুঁতেও রেখেছিলাম। যাতে তারা দেখতে না পায়।’ এই হচ্ছে ফরিদা পারভীনের সঙ্গীতজীবনের শুরুর কথা।
হারমোনিয়াম তো হলো, এবার বেশ জোরেশোরেই শুরু হবে সঙ্গীত শিক্ষা। কিন্তু তার আগে চাই হাতে খড়ি? ‘মাগুরায় স্কুলে পড়ার সময়ে সারগাম দিয়ে গানের হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। এরপর যখন আমি মাগুরা গার্লস স্কুল থেকে কুষ্টিয়া গার্লস স্কুলে আসি, তখন ওস্তাদ ইব্রাহিম গার্লস স্কুলের গানের টিচার। উনি আমার গান শুনে ক্ল্যাসিক্যাল শিখতে বললেন। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। ওনার কাছে ক্ল্যাসিক্যাল শিখতে শুরু করলাম।
‘পরে আরো বড় হয়ে কুষ্টিয়ার রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস, ওসমান গণির কাছে ক্ল্যাসিক্যাল শিখছি এবং শুধু তানপুরার সঙ্গে ছয়-সাত বছর ক্ল্যাসিক্যাল চর্চা করেছি।’
বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে গান শিখেছেন তিনি এবং অনেকে শুনে অবাক হবেন যে আজকের এই জনপ্রিয় লালনসঙ্গীত শিল্পী প্রথম জীবনে পরিচিত হয়েছিলেন নজরুল সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে। ‘আমি প্রথমে নজরুলগীতি শিখতাম কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদেরের কাছে, তারপর মেহেরপুরে মীর মোজাফফর আলীর কাছে। স্বরলিপি দিয়ে যে নজরুলের গান তোলে এটা আমি মীর মোজাফফর আলীর কাছেই প্রথম শিখেছি। ’৬৮ থেকেই আমি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলগীতির শিল্পী।’
তাহলে লালন সঙ্গীতের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কবে থেকে? সংক্ষেপে জানালেন—‘স্বাধীনতার পরে।’
সেটা কি হঠাৎ করেই?
‘হঠাৎ করেও না, আবার হঠাৎ করে। ১৯৭৩ সালে কুষ্টিয়ায় একজন ডাক্তার ছিল, নামটা মনে নেই, লালনের আখড়ার সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল তার। সেই প্রথম আসছিল আমার কাছে। আমাদের কুষ্টিয়ার হসপিটালের বাসায় এসে আমার আব্বারে বলছে যে,—“লালনের আখড়ায় দোলপূর্ণিমায় মহাসমাবেশ হবে, মেয়েটা যদি একটা-দুটো গান করত তাহলে তো ভালো হতো। পূর্ণদাস বাউল আসবে।” তখন আব্বা বললেন যে,—“ওরে একটু জিজ্ঞেস করে নিই, ও তো পাগলি, ওর মন কখন কী বলে...।” আব্বা এসে আমাকে বলল। আমি বললাম,—“দূর, লালন ফকিরির গান করব! এই একটা কথা হল! আমি তো নজরুলের গান করি। সেই আমি ফকিরির গান করব!” তখন ওই ডাক্তার আমাকে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটার একটু টাচ দিলেন। তারপর এলেন মোকসেদ কাকা। উনি সব শুনে বললেন, ঠিক আছে আমি না হয় গানটা তুলে দেব।
‘আমার কিন্তু তখনো মন টানছে না। আব্বা বলল,—“দু-একটা গান শিখে রাখলে অসুবিধা কী, তুমি তো নজরুলের পাশাপাশি আধুনিক গানও করো।” কথা ঠিকই। সে সময়ে আবু জাফর সাহেবও ওই শহরের মধ্যেই থাকতেন, মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসতেন, একটা-দুটো আধুনিক গান আমাকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। যদিও আমার নজরুল সঙ্গীতের প্রতিই বেশি প্রেম ছিল।’
যা হোক, বাবা এবং মোকসেদ কাকার পরামর্শমতো একটা গান শিখে মঞ্চে উঠলেন ফরিদা পারভীন। আর ম্যাজিকটা ঘটলো তখনই। মঞ্চে উঠে যখন ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি ধরলেন, শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলো। আর গান শেষ হওয়ার পরই পাগলের মতো ‘আরেকটা হোক, আরেকটা হোক’ করতে লাগল। ফরিদা পারভীন তখন শ্রোতাদের বললেন, ‘ভাই আবার শিখে আসি, তারপর আরো গান গাইব।’
কথাটা এমনিতেই বলা। কিন্তু লালন সঙ্গীত চর্চার চিন্তাটা হয়তো তখনই তার অবচেতনায় কাজ করেছিল। মঞ্চে প্রথমবারের মতো লালনগীতি গেয়ে শিহরিত ফরিদা পারভীনের মনে তখন এমত চিন্তাও এলো যে, ‘নজরুলের গান গেয়ে তো ফিরোজা বেগম হতে পারব না। কিন্তু লালনের গানটা গাওয়া যেতে পারে। সে সময় লালনের গান মেয়েরা বিশেষ একটা গাইত না। মেয়েরা যে লালনের গান করতে পারে এটা আমাকে দিয়েই ভঙ্গ হয়েছে।’
স্বাধীনতার পর চলে এলেন ঢাকায়। ‘আমার গান দিয়ে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস শুরু হলো। মোকসেদ আলী সাঁই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন, উনি এলেন। তখন ঢাকায় আমাকে অনেকে লালনের গান গাইতে বললেন। সাবিনা ইয়াসমীন ইত্যাদি অনেক আর্টিস্ট দিয়ে তখন উনি ‘খাঁচার ভিতর’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ এই গানগুলো গাইয়েছিলেন, কিন্তু উনি যেটা চেয়েছেন সেটা পাননি। তারপর উনি কুষ্টিয়া থেকে আমাকে এনে অনেক গান শিখিয়েছেন এবং আমি তা ট্রান্সক্রিপশনে রেকর্ডিং করেছি।’
মোকসেদ আলী সাঁই ছাড়াও তিনি লালন সঙ্গীত শিখেছেন খোদা বক্স সাঁই, করিম সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াসিন সাঁই এদের কাছে।
লালন সাঁইজির গানগুলো মূলত তত্ত্বনির্ভর। সেই তত্ত্বনির্ভর গানগুলোতে আধুনিক সুর-তাল সংযোজনার যৌক্তিকতা কি? এ সম্পর্কে শিল্পী ফরিদা পারভীনের বক্তব্য হচ্ছে,—‘হ্যাঁ লালনের গানগুলো তত্ত্বনির্ভর। সুর এবং লয় কিন্তু মানুষকে আলোড়িত করে। যেমন “মিলন হবে কতদিনে” এটা একটা আকুতির গান। কিন্তু এই গানটার রিদম মানুষকে নাচিয়ে তোলে। এই ভেবে আমি এখন লালনের গানকে বৈতালিকে গেয়ে নতুন একটা কিছু সংযোজন করতে চাচ্ছি। কারণ, গানের সুর এবং কথার মাদকতা লয়টা দিলে নষ্ট হয়ে যায়। যেমন—“সময় গেলে সাধন হবে না।” এটা কিন্তু আমি বৈতালিকে করেছি। আমি দেখেছি গানের বাণীটা একরকম আর সুর-তাল আরেকরকম, তাই আমি গানটা শুধু সুরে বৈতালিকে গাইলাম, এর সুরের দিকটা আরেকটু আলোড়িত করে।’
আপনার লালন সঙ্গীত নিয়ে লালনপন্থী সাধুদের কিছু অংশের আপত্তির কথা কি জানেন? প্রশ্নটা করতেই ফরিদা পারভীন বেশ জোরালোভাবে উচ্চারণ করলেন,—‘একটা কথা কিন্তু মনে রাখবেন, আমি লালনের গানের গুরু ধরেই শিখছি— মোকসেদ সাঁই, খোদাবক্স সাঁই, করিম সাঁই আমার লালন সঙ্গীতের গুরু। তবে এটা বলতে পারেন যে, যখন একটি গান আরেকটি পরিশীলিত গলায় ধারণ করে, তখন তার চেহারাটা একটু আলাদা হয় বৈকি। যেমন একটা সাধারণ মেয়েকে আপনি কানে দুল পরাবেন, নাকে নাকফুল পরাবেন তখন তার সৌন্দর্য একটু বৃদ্ধি করবে বৈকি। কারণ আমি তো সঙ্গীতের মানুষ, সঙ্গীত চর্চা করেই লালন সঙ্গীতে এসেছি। সেখানে আমার কণ্ঠে গানটি গাওয়ার পর আলাদা একটা দ্যুতি আসবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এখন আমি যে সুরে গাইছি অনেক বড় বড় গুরুরা তো আমার সুরেই গাইছেন।’
গুরুরা তো শিষ্য পরম্পরায় বিশ্বাসী? একথার উত্তরে ফরিদা পারভীন বলেন,—‘ওরা তত্ত্বের গুরু মানে, আমি সঙ্গীতের গুরু ধরে গান শিখেছি। সাধুরা তত্ত্ব নিয়েই ব্যস্ত, কিন্তু তত্ত্ব দিয়ে লালন সাঁইকে কয়জন চেনে। লালন ফকিরের গান মানেই লালন ফকির।’
লালন সঙ্গীত করে তৃপ্ত ফরিদা পারভীন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সফর করেন লালনের গান নিয়েই। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাস জুড়ে ‘ফরিদা পারভীন প্রজেক্ট কমিটি’র আওতায় তিনি জাপানের বিভিন্ন শহরে, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লালন সাঁইজির গানকে পরিচয় করিয়েছেন। সাঁইজির গান নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বেশ বিস্তৃত, তিনি এখন তাঁর গায়কীতে লালন সঙ্গীতকে বিশ্বময় করার স্বপ্ন দেখেন। এর বাইরে তিনি আরো বলেন,—‘লালনের গান নিয়ে বর্তমানে স্বরলিপি করছি। স্বরলিপির কাজ করার উদ্দেশ্য লালনের গানের গায়কীটা ধরে রাখা।’ তার কাছেই জানা গেল, ‘ফরিদা পারভীন ট্রাস্ট’ হতে যাচ্ছে। ট্রাস্টের পরিকল্পনায় আছে— লালনের গান সংগ্রহ, স্বরলিপি, স্টাফ নোটেশন, লালনের গানের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রের আর্কাইভ ইত্যাদি। অন্যান্য ফোক গানও সংরক্ষণ করা হবে এবং বছরে একটা করে অন্তত লালন সঙ্গীতের সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করবেন তারা। ‘এখন লালন নিয়েই আমার সব চিন্তা।’
হালের অনেক তরুণ-তরুণীই নিজেদের মতো করে লালন সঙ্গীত গাইছে, এসম্পর্কে ফরিদা পারভীনের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। তাঁর কথা হচ্ছে,—‘লালনের গান ভক্তি দিয়ে শিখে গাইতে হবে। লালনের সঙ্গীতের গুরু ধরে গাইতে হবে। শুনে শুনে নিজের মতো করে গাইলাম, তা কিন্তু হবে না।’
এযাবৎ লালন সঙ্গীত নিয়ে ফরিদা পারভীন জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, অ্যামেরিকা, ইংল্যান্ডসহ আরো বহু দেশে গিয়েছেন। তাঁর হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে একটি স্মৃতি। ‘ ঘটনাটা ১৯৮৪-৮৫ সালের। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ডেলিগেটস গিয়েছিল সুইডেনে, সেই সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন সাঈদ আহমদ, উনার সামনেই ঘটনাটা ঘটে। সুইডেনের রানী গ্রামে থাকেন, তার গ্রামের বাড়িতেই আমাদের নিয়ে গেছেন, সেখানে “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” গানটা গাইছি। শুনে রাণী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। রানী তো কথা বুঝতে পারছেন না। তিনি শুধু একটা কথাই বললেন, ‘ওর গায়কী, ওর সুরের যে ডেপথনেস, তাতে আমার মনে হলো ওর কণ্ঠের মধ্যে ঈশ্বর বাস করছে। ...ওর কথা বোঝার আমার দরকার নেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ওর সুরের ভেতর একটা কষ্ট লুকিয়ে আছে, সেই কষ্টটা আমার কষ্টের সঙ্গে মিলে গেছে।’
গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হয়েছেন লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন। লালন সঙ্গীতের কথা বললে যে শিল্পীর মুখটি অনিবার্যভাবে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সেই ফরিদা পারভীন কিন্তু নজরুল সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই তৈরি হয়েছিলেন শৈশবে। কী করে ঘটল এই পালাবদল? ফরিদা পারভীনের সঙ্গে কথা বলে আরও অনেক অজানা তথ্য জেনেছিলেন সাইমন জাকারিয়া। সেসব ছাপা হয়েছিল ২০০৩ সালের ৯ আগস্ট প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’তে। শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটির নির্বাচিত অংশ পুনঃপ্রকাশ করা হলো।