নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণার ঘণ্টা কয়েক আগে থেকেই নরওয়ের রাজনীতি ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর নীরবতা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এ বছর পুরস্কার না পান তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন নরওয়েজিয়ান রাজনীতিক ও পর্যবেক্ষকেরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
নরওয়ের নোবেল কমিটি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কারের জন্য তাদের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। সোমবার সেই নাম চূড়ান্ত করা হয়। এর কয়েক দিন পরই ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। ফলে, বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এ সময়সূচি বিবেচনায় ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত।
নরওয়ের সোশ্যালিস্ট লেফট পার্টির নেতা কির্সতি বার্গস্তো বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক দিকে আমেরিকাকে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা আক্রান্ত। গোপন পুলিশের মাধ্যমে নাগরিকদের অপহরণ, বিচার বিভাগের ওপর দমননীতি—সব মিলিয়ে তিনি এক অস্থির ও কর্তৃত্ববাদী চরিত্র। তাই আমরা যে কোনও পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বাধ্য।
তিনি আরও বলেন, নোবেল কমিটি একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা, নরওয়েজিয়ান সরকারের কোনও এখতিয়ার সেখানে নেই। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, ট্রাম্প এই বিষয়টি বোঝেন কি না।
ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৯ সালে এই পুরস্কার পান আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সহযোগিতা জোরদারে তার অবদানের জন্য। ট্রাম্পও নিজেকে সেই কাতারে দেখতে চান। জুলাই মাসে তিনি নরওয়ের অর্থমন্ত্রী এবং সাবেক ন্যাটো মহাসচিব ইয়েন্স স্টলটেনবার্গকে ফোন করে নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল।
নরওয়ের গ্রিন পার্টির নেতা আরিল্ড হার্মস্তাদ বলেন, নোবেল পুরস্কার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রোধ দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে জেতা যায় না। এটি ধারাবাহিক শান্তির প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ট্রাম্পের ভূমিকা স্বাগত, তবে একটি দেরিতে নেওয়া পদক্ষেপ। এতে বহু বছরের বিভাজন ও সহিংসতাকে মুছে দিতে পারে না।
নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটের পরিচালক ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন বলেন, সোমবারের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে অরাজনৈতিক, যদিও কমিটির সদস্যদের নরওয়েজিয়ান পার্লামেন্ট কর্তৃক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি করে।
নরওয়ের বিশ্লেষক হ্যারাল্ড স্টাংহেলে বলেন, ট্রাম্প যদি পুরস্কার না পান, তবে তার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ শুল্ক, ন্যাটো অনুদান বৃদ্ধি কিংবা নরওয়েকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মতো ঘটনায় রূপ নিতে পারে। তিনি এতটাই অনিশ্চিত ব্যক্তি যে তার পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি ট্রাম্প পুরস্কার পান, তবে সেটি হবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিস্ময়।’
ওসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (প্রিও) পরিচালক নিনা গ্রেগার মনে করেন, এ বছর শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রাপকদের মধ্যে রয়েছে সুদানের এমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং উইমেন’স ইন্টারন্যাশনাল লিগ ফর পিস অ্যান্ড ফ্রিডম।
গ্রেগার বলেন, গাজা যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়, তবে সেই উদ্যোগ টেকসই শান্তি আনতে পারে কি না, তা বলার এখনই সময় নয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে তার সরে আসা, গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা এবং গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব— সব মিলিয়ে নোবেলের ভাবনার সঙ্গে তা যায় না।
নরওয়ে সরকার তাই এখন অপেক্ষায়, পুরস্কার ঘোষণার পর ট্রাম্প কী বলেন বা করেন সেই প্রতিক্রিয়ার জন্য। কারণ, নরওয়েজিয়ান রাজনীতিকেরা বলছেন, ‘ট্রাম্পের ক্ষেত্রে কিছুই অসম্ভব নয়।’