রাশিয়া যে কোনও সময় ন্যাটোর ভূখণ্ডে সীমিত সামরিক হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে বলে সতর্ক করেছেন জার্মান সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আলেক্সান্ডার সোলফ্রাংক। তবে তিনি বলেন, এমন পদক্ষেপ নেবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে পশ্চিমা জোটের বর্তমান অবস্থানের ওপর। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
সোলফ্রাংক বলেন, রাশিয়ার বর্তমান সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধশক্তি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা চাইলে আগামীকালই ন্যাটোর ভূখণ্ডে ছোট পরিসরে, স্বল্প সময়ের জন্য, সীমিত আক্রমণ শুরু করতে পারে। বড় আকারে নয়।কারণ ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এখনও যথেষ্ট ব্যস্ত।
তিনি আরও জানান, রাশিয়া যদি সামরিক পুনর্গঠন অব্যাহত রাখে, তবে ২০২৯ সালের মধ্যেই বৃহৎ আকারের আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এটি ন্যাটোর ৩২ সদস্যদেশের জন্য সরাসরি হুমকি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবশ্য আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য অস্বীকার করে দাবি করেছেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে তাদের পূর্ণমাত্রার আক্রমণ ছিল ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা উদ্যোগ।
বার্লিনের উত্তরাঞ্চলে নিজ কার্যালয়ে বসে সাক্ষাৎকারে সোলফ্রাংক বলেন, ইউক্রেনে ক্ষয়ক্ষতির পরও রাশিয়ার বিমানবাহিনী এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী অক্ষত আছে, আর কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহর আংশিক ক্ষতির শিকার হলেও অন্যান্য বহর এখনও কার্যকর।
সোলফ্রাংক বলেন, স্থলবাহিনীতে ক্ষতি হচ্ছে বটে, কিন্তু রাশিয়া এখন সেনাসংখ্যা ১৫ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। তাদের হাতে যথেষ্ট প্রধান যুদ্ধট্যাংকও রয়েছে। ফলে সীমিত আক্রমণ আগামীকালও সম্ভব, যদিও এখনই এমন কোনও পরিকল্পনার প্রমাণ নেই।
তিনি ২০২৪ সালে গঠিত জার্মানির যৌথ অপারেশন কমান্ডের প্রধান। এটি আফগানিস্তান বা মালি মিশনের মতো অভিযানের পরিবর্তে ন্যাটো ভূখণ্ড রক্ষার কৌশলে গুরুত্ব দেয়। এর আগে তিনি দক্ষিণ জার্মানির উল্ম শহরে অবস্থিত ন্যাটোর লজিস্টিক কমান্ড জেএসইসি পরিচালনা করতেন।
সাম্প্রতিক পোল্যান্ডের আকাশসীমায় রুশ ড্রোনের অনুপ্রবেশ পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জাতীয় আয়ের ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এতে ব্যয় প্রায় ১৬০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাবে, যা ২০২৫ সালে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো ছিল। পাশাপাশি দেশটি সেনাসংখ্যা ৬০ হাজার বাড়িয়ে মোট ২ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও করছে।
সোলফ্রাংক বলেন, রাশিয়া হামলার সিদ্ধান্ত নেবে তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে- তাদের সামরিক সক্ষমতা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের মনোভাব। এই তিন উপাদান মিলিয়ে বলা যায়, ন্যাটোর ওপর রুশ আক্রমণ সম্ভাবনার আওতার মধ্যে আছে। এটি হবে কি না, তা নির্ভর করবে মূলত আমাদের আচরণের ওপর।
তিনি বলেন, রাশিয়ার ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ ও ভয় প্রদর্শন হাইব্রিড যুদ্ধ কৌশল ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাশিয়ানরা একে বলে নন-লিনিয়ার ওয়ারফেয়ার, যা প্রচলিত যুদ্ধের আগের ধাপ। আর পারমাণবিক হুমকি দেখানো হচ্ছে একধরনের ভয় প্রদর্শনের যুদ্ধ হিসেবে।
তার মতে, রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো ন্যাটোকে উত্তেজিত করা, প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা এবং জোটের ভেতর ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানো। তারা নিরাপত্তা দুর্বল করতে, আতঙ্ক ছড়াতে, ক্ষতি করতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে এবং আমাদের সহনশীলতা পরীক্ষা করতে চায়।