অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক: আলোচিত কাস্টমস কমিশনার বেলালের দেশত্যাগ

অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক: আলোচিত কাস্টমস কমিশনার বেলালের দেশত্যাগ

বেনাপোল কাস্টমস বিভাগের আলোচিত কর্মকর্তা সাবেক কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি জীবনে যেখানেই পদায়ন পেয়েছেন, সেখানেই জড়িয়েছেন সীমাহীন দুর্নীতিতে। বিগত আওয়ামী সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দুই হাতে নিয়েছেন সুবিধা।

তার বিরুদ্ধে বৈধ  সম্পদ গড়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ইতোমধ্যে দুদকের আবেদনে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত বেলাল হোসাইন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী হোসনা ফেরদৌস সুমির বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি অষ্ট্রেলিয়ায় চলে চলে যাওয়ার খবরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বেলালের যত সম্পদ

বেলাল হোসেন এবং তার স্ত্রীর নামে দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে— রাজধানীর বারিধারায় এফ ব্লকে ১২ নম্বর প্লটে পাঁচকাঠা জমির ওপর পাঁচতলা বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। নিউ ইস্কাটন রোডে বেস্ট উইশেস অ্যাপার্টমেন্টে রয়েছে চার হাজার বর্গফুটের চার কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, যা তার স্ত্রীর নামে কেনা। বারিধারা ডি ব্লকে পাঁচ কাঠা এবং পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট। যমুনা ফিউচার পার্ক ও অন্য আরেকটি মার্কেটে কোটি টাকা মূল্যের চারটি দোকান, আশুলিয়ায় ১০ বিঘা জমি ও ভাইয়ের নামে গার্মেন্টস রয়েছে গাজীপুরে।

ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়ি, যার দাম দেড়শ কোটি টাকা এবং একই এলাকার ৫ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়িটিও  বেলাল চৌধুরীর নামে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে যশোর এসপি অফিসের পাশে ১৫ কাঠা জমির ওপর ১৫ তলা ভবন নির্মাণ, সিভিল সার্জন অফিসের পাশে ৩৩ শতাংশ জমি কিনে ৭৫ কোটি টাকা দিয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণ এবং নোয়াখালী শহরে ৭৫ কোটি টাকা দিয়ে ১০ কাঠা জমির ওপর ৬ তলা বাড়ি নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নিজ উপজেলা সোনাইমুড়িতে রয়েছে ৫০ বিঘা জমি।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, অভিযোগ আছে, বেলাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বিদেশেও। কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি আছে এই কর্মকর্তার, যেখানে তার ছেলে-মেয়েরা বসবাস করেন। আছে দুবাই মেরিনায় ফ্ল্যাট, ডাউন টাউনে বাড়ি, এমনি স্পেস কিনেছেন বুর্জ আল খলিফায়। বিনিয়োগ সূত্রে পেয়েছেন দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসা। দুবাই ভ্রমণে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না। অনুমতি ছাড়াই ভ্রমণ এবং বিনা ছুটিতে সেদেশে অবস্থান করা, যেন তার কাছে ‘ডালভাত’। দুর্নীতির টাকায় স্ত্রী, ভাই-বোন ও শ্যালকের নামেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বেলাল। শেয়ার মার্কেট কেলেংকারি এবং বিটকয়েন সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুদক বরাবর অভিযোগে।

বেলালের বিরুদ্ধে আরও যত অভিযোগ

দুদকের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সরকারের একাধিক দফতরে করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কাস্টমসে ঘুষের মাধ্যমে পণ্য খালাস দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। বেনাপোল কাস্টমসে থাকার সময়ে ৮০ লাখ টাকার পণ্যের বিপরীতে মাত্র ১১ লাখ টাকায় ট্যাক্স দিয়ে সাতটি পণ্যবাহী ট্রাক ছেড়ে দেওয়া হয় তার নির্দেশে। পরবর্তী সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কাউসার আলম পাটোয়ারী ওই মালামাল জব্দ করলেও আবারও মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ট্রাকগুলো খালাস করে দেন তিনি। এছাড়া বেনাপোলে কমিশনার পদে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে কাস্টমসে স্বর্ণ ও ডলার নিয়ে একাধিক কেলেংকারির অভিযোগ উঠেছিল। কুমিল্লায় দায়িত্বরত অবস্থায় বন্ধ ইপিজেড প্রতিষ্ঠানের নামে মদের চালান খালাস করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন বেলাল। যুক্তরাষ্ট্র, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস ও মাল্টা তিন দেশের পাসপোর্টও রয়েছে তার।

অবশেষে দুদকের জালে

চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন গালিবের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেলাল হোসাইন চৌধুরী এবং তার স্ত্রী হোসনা ফেরদৌস সুমির বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। এদিন দুদকের পক্ষে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন কমিশনের উপ-পরিচালক সালাহউদ্দিন। শুনানি শেষে বিচারক আবেদন মঞ্জুর করেন।

দুদকের উপ-পরিচালক সালাহউদ্দিন তার আবেদনে বলেন, ‘‘বেলাল হোসাইন চৌধুরীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণী যাচাইসহ ঘুষ, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অনুসন্ধানকালে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা অভিযোগসহ বিভিন্ন  গোপনীয় উৎসের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশে ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তাছাড়া তিনি তার ভাইসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডেভেলপার, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিসহ শেয়ার বাজারে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্জিত অর্থ দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভিন্ন মাধ্যমে হস্তান্তর ও স্থানান্তর করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।’’

আবেদনে আরও বলা হয়, ‘‘অনুসন্ধানকালে জানা যায়, বেলাল হোসাইন চৌধুরী সপরিবারে  গোপনে দেশত্যাগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি দেশত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে গেলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তাছাড়া সার্বিক অনুসন্ধান কাজে বিঘ্ন সৃষ্টিসহ ক্ষতির কারণ রয়েছে। তাই সুষ্ঠু অনুসন্ধান কার্যক্রমের স্বার্থে তাদের বিদেশ যাত্রা রোধ করা একান্ত প্রয়োজন।’’

এদিকে ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান বেলাল। বিষয়টি ফাঁস হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ সদরদফতর পরে অবশ্য এর ব্যাখ্যাও দেয়। সেখানে বলা হয়, ‘‘চলতি বছরের গত ২ ফেব্রুয়ারি আদালত মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিদেশ গমন রোধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তবে পরে ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেন। সরকারি কাজে বিদেশ গমনের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন (জিও) জারিও করা হয়।

আদালতের আদেশ ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে ইমিগ্রেশন পুলিশ তার বহিঃ ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।’’

এ বিষয়ে কাস্টমসের উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) আকতারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা অবাক হয়েছি, তিনি দেশত্যাগ করেছেন। তবে তিনি দেশে আর ফিরে না আসলেও আমাদের তদন্ত অব্যাহত থাকবে।’’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin