ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ইইউবি) নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ছেলের দখল থেকে অবশেষে মুক্ত করতে পেরেছেন প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন এক আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সাময়িকভাবে পুনর্বহাল হয়েছেন তিনি।
হাইকোর্টে রিটের রায়ের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ছয় মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খানকে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। এছাড়া হাইকোর্টকে রুল নিষ্পত্তির আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ফলে প্রতিষ্ঠিত চেয়ারম্যানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ এবং কার্যক্রম পরিচালনায় কেউ বাধা দিতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, ইইউবি পরিচালনা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান ও তার ছেলে আহমেদ ফরহাদ খান তানিম। অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান। তবে আহমেদ ফরহাদ খান তানিম জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি পরিবর্তন ও দখলে নেন। ছেলের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডে অবৈধভাবে পরিবর্তনের অভিযোগ আনেন অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান। যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরে রেজিস্ট্রারের কাছে এ নিয়ে অভিযোগপত্রও পাঠান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) লিখিতভাবে অভিযোগ করেন। ইউজিসি বিষয় তদন্ত করছে। ছেলের হুমকির কারণে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান। সর্বশেষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
উচ্চ আদালতে রিট
নিজের প্রতিষ্ঠা করা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে না পারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালনায় চেয়ারম্যান পদ ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান। গত ৬ অক্টোবর হাইকোর্ট বেঞ্চ ইইউবির চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে পুনর্বহালের রায় দেন। ওই রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল আবেদন করেন আহমেদ ফরহাদ খান তানিম। গত ১৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। পরে ২০ অক্টোবর আপিল শুনানিতে চেম্বার বিচারপতির আদালতের স্থগিতাদেশটি বাতিল করে উচ্চ আদালতের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খানের পক্ষে আদালতে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, শিশির মনির, আইনজীবী মো. তহিদুদ্দিন শিপন ও মোহাম্মদ আব্দুল হাই।
জানতে চাইলে আইনজীবী মো. তহিদুদ্দিন শিপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চেম্বার বিচারপতির আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। পরে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি পর রায় বলবৎ রেখে হাইকোর্টকে রুল নিষ্পত্তি করতে বলেছেন আপিল বিভাগ। ছয় মাসের জন্য অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান তার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ছয় মাসের জন্য তাকে দায়িত্ব পালনে বাধাদানে বিরত থাকতে বলা হয়েছে আপিলের রায়ে।’
ছেলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন
ইইউবির ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে ছেলে আহমেদ ফরহাদ খানের বিরুদ্ধে গত ১১ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন ড. মকবুল আহমেদ খান।
জাতীয় প্রেসক্লাবে ওই সংবাদ সম্মেলন তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করি। এরই মধ্যে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। ২০২৪ সালের অগাস্টের পর কিছু শিক্ষার্থীর দাবি এবং আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে আমার ছেলে আহমেদ ফরহাদ খান জোর-জবরদস্তি করে আমাকে দিয়ে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে সে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় দখলের জন্য তার আশ্রিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর দ্বারা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেয়। প্রায় এক বছর আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি। আমি বারবার চেষ্টা করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারিনি, সন্ত্রাসীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছি।’
ড. মকবুল আহমেদ খান বলেন, ‘আমার অজান্তেই আহমদ ফরহাদ খান অবৈধভাবে সই এবং নথি জালিয়াতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে চার জন সদস্যকে অপসারণ করে এবং তার স্ত্রীর দুই জন আত্মীয়কে ঢুকিয়ে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরে নতুন ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন করিয়ে নেয়। এটি জানতে পেয়ে এই অবৈধ সদস্যদের অপসারণের প্রতিকার চেয়ে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরে চিঠি দেই। আমার চিঠি পেয়েও তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। তিনবার লিখিত চিঠি দিলেও সাড়া পাইনি।’
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সারা জীবনের অর্জন দিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছি। ২০১০ সালে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরের অনুমোদন এবং ২০১২ সালে সরকারের অনুমোদন পাই। বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালোভাবেই চলছিল। ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত না হোক। আমি বিশ্ববিদ্যালয়টি ওয়াকফ করে দিয়ে যাবো, যাতে সেটি জনকল্যাণে কাজে লাগে। এটি বুঝতে পেরে ২০২৪ সালে আমার ছেলে ও তার ভায়রা মিলে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তারা জালিয়াতি করে আমাকে এবং আমার গুরুস্থানীয় একজন ব্যক্তিকে ট্রাস্টি বোর্ড থেকে বের করে দিয়ে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরে পরিবর্তনের অনুমোদন নেয়। আমি প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এ বিষয়টি ইউজিসি এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতর জানে। পরিস্থিতির কারণে আমাকে নিজ বাড়ি থেকে বাইরে থাকতে হয়েছে।’
বিরোধ মেটাতে ইউজিসির তদন্ত কমিটি
ইউজিসি জানায়, বাবা ও ছেলের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্ষতি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রাস্টি যদি বৈধ না হয় তাহলে কীভাবে ভিসি নিয়োগ বৈধ হতে পারে? এসব খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যদের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’
অবৈধ দখল ঠেকাতে ছাত্রদের ভূমিকা
ইইউবি ট্রস্টি বোর্ড দখল করা চেয়ারম্যান আহমেদ ফরহাদ খান তানিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা। গত ২ জুলাই ইইউবির গাবতলীর স্থায়ী ক্যাম্পাসে বর্তমান ও সাবেক ছাত্রদের উদ্যোগে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. শরীফুল ইসলাম ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান রাঙা জানান, আহমেদ ফরহাদ খান তানিম দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছেন। শ্যামলী ক্যাম্পাসের ৩০ কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার স্কয়ার ফুটের ফ্লোর বিক্রি করা হয়েছে। ভুয়া এজিএম দেখিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড থেকে জোরপূর্বক চার জনকে সরিয়ে নিজের স্ত্রীর ভগ্নিপতিসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন আহমেদ ফরহাদ খান তানিম। জোরপূর্বক বিনা নোটিশে ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। এসবের প্রতিবাদ করলে সাধারণ ছাত্রদের হুমকি, হামলা, মামলার ভয় দেখানো হয়।