বাংলাদেশে অনলাইন শিশু নির্যাতন, যৌন শোষণ ও পর্নোগ্রাফি বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) জন্য বাধ্যতামূলক কোড অব কনডাক্ট, পর্নোগ্রাফিক সাইট ফিল্টারিং, আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘স্টেপ আপ দ্য ফাইট এগেইনস্ট সেক্সচুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অব চিলড্রেন’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত সভায় এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। টেরে দেস হোমস নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
বিশ্ব ও বাংলাদেশে অনলাইন যৌন নির্যাতনের বিস্তার
সভায় টেরে দেস হোমস নেদারল্যান্ডসের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মো. নুরুল কবির জানান, বিশ্বব্যাপী ১২–১৭ বছর বয়সী প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিশু নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার বড় অংশই অনলাইন নির্যাতন ও যৌন শোষণের ঝুঁকিতে থাকে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ শিশু অনলাইন যৌন নির্যাতন বা সাইবারবুলিংয়ের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন; এর বড় অংশই শিশু-কিশোর। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতার শিকার। ২১ শতাংশ গ্রামীণ শিশু যৌন কনটেন্টযুক্ত বার্তা পায় এবং প্রায় ১৭ শতাংশ শিশু অনলাইনে অশ্লীল ভিডিও বা ছবি পায়। আইনি বাধা, সামাজিক লজ্জা ও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে বেশিরভাগ ঘটনা অজ্ঞাতই থেকে যায়।
আইনগত ঘাটতি ও নীতিমালা বাস্তবায়নে দুর্বলতা
সভায় বলা হয়, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২, শিশু আইন-২০১৩, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ থাকা সত্ত্বেও অনলাইন শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় স্পষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালা নেই। ISP–এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই, তদারকি দুর্বল এবং স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি রয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আইনি বিধানের কঠোর প্রয়োগ না হওয়ায় শিশু সুরক্ষার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিটিআরসি ও আইএসপি–দের ভূমিকা: ফিল্টারিং, ব্লকিং ও মনিটরিং অপরিহার্য
সংলাপে বিটিআরসি–কে পর্নোগ্রাফিক সাইট চিহ্নিত, ব্লকিং নির্দেশনা জারি এবং আন্তর্জাতিক গেটওয়ে পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়। আইএসপিএবি ও আইএসপি–দের ডিএনসি ব্লকিং, ফায়ারওয়াল, ফিল্টারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট রোধ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ব্রাউজিং প্ল্যাটফর্ম তৈরির আহ্বান জানানো হয়। আইএসপি–দের গ্রাহকদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা ছড়ানো এবং রিপোর্টিং সিস্টেম চালুর কথাও উঠে আসে।
অভিভাবক ও সমাজের ভূমিকা
সন্তানদের অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা, নিরাপত্তামূলক সফটওয়্যার ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা এবং সন্দেহজনক কোনো আচরণ দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো—এসব পদক্ষেপ গ্রহণে অভিভাবকদের গুরুত্ব আরও বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ইউম্যান সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ফারহানা ইয়াসনি বলেন, “শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধরনের অপরাধ ও ভিকটিমাইজেশন ভয়াবহভাবে বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “অতীতে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু এখন প্রযুক্তি শিশুদের জন্য ‘নতুন দানবীয় শক্তি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কিভাবে শিশুদের মগজ দখল করছে, তারা অল্প বয়সে কিভাবে পর্নগ্রাফি, ভুল বন্ধুত্ব ও বিপথগামিতায় জড়িয়ে পড়ছে—এগুলো নিয়মিতই তাদের মামলার মাধ্যমে উঠে আসে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “অনেক কিশোর-কিশোরী পরিবারে থেকেও একা হয়ে পড়ে, অনলাইনের কালচার ও আইডল ফলো করতে গিয়ে পরিচয় বদলে ফেলে, চ্যাটবট বা অপরিচিত অনলাইন ব্যক্তিকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু মনে করে। এ কারণে বাড়ি থেকে পালানো, আর্থিক প্রতারণা, যৌন শোষণ ও মানসিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “শুধু দুই-চারটি উঠান বৈঠক, সচেতনতা অনুষ্ঠান বা স্কুলে একবারের ক্যাম্পেইন দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবার, স্কুল, রাষ্ট্র কোনও স্তরেই সঠিক প্রস্তুতি নেই। বিদেশে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়ন্ত্রণ, স্ক্রিন-টাইম সীমা, অভিভাবককে মনিটরিংয়ের ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বয় আছে, বাংলাদেশ সেখানে গুরুতরভাবে পিছিয়ে।”
ফারহানা ইয়াসনি সতর্ক করে বলেন, “সঠিক পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তিজনিত বিপথগামিতা মহামারির মতো আকার নেবে।”
তিনি অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ববান ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা আমাদের সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, একটি মোবাইল কখন ব্যবহার করবে—এটাই ঠিক করতে না পারলে—সমস্যা শুধু বাড়তেই থাকবে।”
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা জেবা বলেন, “শিশুদের হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট তুলে দেওয়ার পর অভিভাবকরা তা মনিটরিং না করায় তারা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, যা উদ্বেগের কারণ।”
তিনি জানান, মহিলা উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের পাশাপাশি কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে তারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, পুলিশ, সাংবাদিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত ওয়ার্কশপ করেন। দেশের ৬৪ জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠিত হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো হাইকোর্ট নির্দেশিত পাঁচ সদস্যের কমিটি ও অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেনি। কিশোর-কিশোরী ক্লাব ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তারা যৌন হয়রানি ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
জেবা বলেন, “সন্তানের ডিভাইস ব্যবহার প্রথমে অভিভাবকদেরই মনিটর করতে হবে এবং পরিবার, স্কুল-কলেজ ও সিভিল সোসাইটি—সবাইকে এই বিষয়ে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, “ইন্টারনেট আজ আশীর্বাদের পাশাপাশি বিভ্রান্তি ও ঝুঁকিও তৈরি করেছে। পরিবারের ভেতরে সন্তানরা নিরাপদ মনে হলেও অনলাইনে তারা আরও বড় বিপদের মুখে পড়ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবার, স্কুল ও সমাজ সবারই সচেতন হওয়া জরুরি। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং শিশুদেরকে কীভাবে নিরাপদভাবে অনলাইন ব্যবহার করতে হবে তা অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, পিতামাতারা অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না; তাই স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “বিটিআরসি ইন্টারনেট সেবা নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের লাইসেন্স সংস্কার করেছে এবং নতুন গাইডলাইনে সব মোবাইল অপারেটর ও আইএসপির জন্য বাধ্যতামূলক ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ যুক্ত করা হয়েছে। তবে আইএসপির সংখ্যা বেশি ও সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সামাজিক ও ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করে বন্ধ করার ক্ষমতা বিটিআরসির নেই; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরই এসব নির্ভর করে।”
ফেসবুক বিটিআরসির প্রেরিত লিংকের মাত্র ৩৮ শতাংশ এবং ইউটিউব ২৭ শতাংশ ব্লক করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মনিরুজ্জামান আরও বলেন, সাইবার নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে সমাজ ও পরিবারের ভূমিকা—ক্ষতিগ্রস্ত কেউ যেন পরিবার, স্কুল বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নির্ভয়ে রিপোর্ট করতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সংলাপের প্রস্তাবনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
সভায় শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন, পর্নোগ্রাফিক সাইটের তালিকা প্রস্তুত, ISP–লেভেলে বাধ্যতামূলক ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত মনিটরিং এবং নাগরিক সমাজের তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকে সাইবার নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা, সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো এবং অনলাইন নির্যাতন রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে সহজ করার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচনা সভায় বলা হয়, বিটিআরসি, আইএসপিএবি, মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। অনলাইন যৌন নির্যাতন মোকাবিলায় শক্তিশালী নীতি, কার্যকর ফিল্টারিং ব্যবস্থা, আইনি কাঠামোর বাস্তবায়ন এবং সমাজের যৌথ ভূমিকা অত্যাবশ্যক।