মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কসহ একাধিক বিতর্ক ঘিরে ভালোমতোই বেকায়দায় পড়েছেন ব্রিটিশ যুবরাজ অ্যান্ড্রু। রাজপরিবারের ভাবমূর্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সামরিক খেতাব ও সম্প্রতি রাজকীয় সম্মাননা পরিত্যাগের ঘোষণা দিলেও আখেরে খুব একটা লাভ হবে না বলেই মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমালোচকরা বলেছেন, রাজপরিবারের তরফ থেকে অ্যান্ড্রুকে অনেকটা একঘরে করে দেওয়া এবং খেতাব সরিয়ে নিয়ে সার্বিক শুদ্ধি অভিযানের বদলে কোনও রকমে ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ধরনের দায়সারা পদক্ষেপের কারণে ইস্যুটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, যা এখন রাজা তৃতীয় চার্লসের সুনামকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
তবে, ভাবমূর্তি বজায় রাখতে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত প্রায় পাকাপোক্ত করে ফেলেছে রাজপরিবার। যেমন ভবিষ্যৎ কোনও অভিষেক অনুষ্ঠানে বা স্যান্ড্রিংহামে ঐতিহ্যবাহী বড়দিন উৎসবসহ সব রাজকীয় আয়োজন থেকেই তাকে দূরে রাখা হবে। এমনকি তার স্ত্রী সারা ফার্গুসনকেও এসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হবে না বলে জানা গেছে।
অ্যান্ড্রুকে খেতাব ত্যাগে বাধ্য করার সিদ্ধান্তের সময় প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে ‘পরামর্শ’ করা হলেও সূত্র বলছে, তিনি এখনও অসন্তুষ্ট। প্রিন্স অফ ওয়েলস মনে করেন, এটি প্রথম ধাপ মাত্র। ভবিষ্যতে রাজদণ্ড তার হাতে এলে চূড়ান্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি তাকে দিতে হবে।
অভিযোগ সামাল দেওয়ার অস্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে রাজপরিবার। রানির সন্তান হওয়ার কারণেই অ্যান্ড্রু তার ডিউক অফ ইয়র্ক এবং প্রিন্স খেতাব আসলে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। তাই অ্যান্ড্রুকে পার্লামেন্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে খেতাব কেড়ে নেওয়ার পরিবর্তে কেবল সেগুলো ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তকে অনেকেই জবাবদিহিতা এড়ানোর অপ্রতুল ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
পুরোপুরি তাকে রাজ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে না দেওয়ায় আইনপ্রণেতাদের ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এমপি র্যাচেল মাস্কেল দাবি করেছেন, ইয়র্ক শহরের সঙ্গে যুক্ত এই 'লজ্জার অধ্যায়' বন্ধ করতে খেতাবটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হোক।
পুরো বিষয়টি আরও ঘোলাটে হয়েছে এপস্টেইনের ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিওফ্রেকে ২০২২ সালে অ্যান্ড্রুর দেওয়া ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের নিষ্পত্তি নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ হয়তো তার ব্যক্তিগত আয় থেকে আংশিকভাবে এই অর্থ প্রদান করেছিলেন। এই ঘটনায় জনগণের সম্পদ অপব্যবহার এবং রাজ পরিবারের ক্ষমতা ব্যবহার করে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগকে উসকে দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর সমালোচনা এসেছে জিওফ্রের পরিবার ও অন্যান্য এপস্টেইনের অন্যান্য ভুক্তভোগীদের অভিযোগের কারণে। জিওফ্রের ভাই স্কাই রবার্টস রাজা চার্লসের কাছে জরুরি ভিত্তিতে অ্যান্ড্রুর প্রিন্স পদবিটি তুলে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমান পদক্ষেপটি প্রকৃত ন্যায়বিচারের একটি পদক্ষেপ মাত্র। অ্যান্ড্রুর খেতাব ত্যাগের খবরটি তিক্ত-মধুর হলেও, এটি বছরের পর বছর ধরে তিনি যে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা পেয়েছেন, তা-ই তুলে ধরছে।
এই বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে নতুন কিছু অত্যন্ত ক্ষতিকর তথ্য প্রকাশের সময়কাল।
জিওফ্রের মরণোত্তর স্মৃতিকথা নো বডিস গার্ল-এর অংশবিশেষে তার ওপর হওয়া কথিত নিগ্রহের আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো, স্মৃতিকথাটি থেকে জানা যায় যে অ্যান্ড্রু তার দেওয়ানি নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে এক বছরের জন্য গ্যাগ অর্ডার দেওয়ার শর্ত দিয়েছিলেন, যাতে জিওফ্রে ২০২২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীর জাঁকজমককে ম্লান করতে না পারেন—এই পদক্ষেপকে ভুক্তভোগীর কথা বলার অধিকারের চেয়ে রাজকীয় আড়ম্বরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া, জিওফ্রের সঙ্গে তার বিতর্কিত ছবি প্রকাশের পরদিনই অ্যান্ড্রু এপস্টেইনকে ২০১১ সালে একটি ইমেইলে লিখেছিলেন, মনে হচ্ছে আমরা একসঙ্গে এর মধ্যে জড়িয়ে আছি। এই ইমেইল প্রকাশের পর অ্যান্ড্রুর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ, এটি তার ২০১৯ সালের নিউজ়নাইটে দেওয়া সাক্ষাৎকারে করা দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত—যেখানে তিনি বলেছিলেন, তিনি আগেই এই সাজাপ্রাপ্ত যৌন অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।
এছাড়া, তার বিরুদ্ধে যুক্ত হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির আরেকটি স্তর। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, অ্যান্ড্রু ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে অন্তত তিনবার এক চীনা ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ওই ব্যক্তি একজন সন্দেহভাজন গুপ্তচর এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।