পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে?

পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে?

পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি যৌথ কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, যে কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে।

বুধবার সন্ধ্যায় সৌদি রাজধানী রিয়াদে আল ইয়ামামা প্রাসাদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ চুক্তিতে সই করেন। দুই নেতা চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, গত আট দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত স্বার্থ ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ধারাবাহিকতায় এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি  সই হলো। চুক্তিটি এমন সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর আরব বিশ্বে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।  

ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। কোনো এক দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে।  

এতে বলা হয়েছে, এই চুক্তি শুধু দুই দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলসহ বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান ও সৌদি আরবের যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন। চুক্তি সইয়ের পর সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় লেখেন— সৌদি আরব ও পাকিস্তান... আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সারিতে... চিরকাল এবং অনন্তকাল।  

পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরনো। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠিত হয়, সেখানে পাকিস্তানের সহযোগিতায় বিশেষ বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। ওই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) রাহিল শরিফ।

তবে সদ্য স্বাক্ষরিত এই যৌথ কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি পাকিস্তান ও সৌদি আরব। এদিকে পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের পক্ষ থেকে এর প্রতিক্রিয়া এসেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দিকে নজর রাখছি এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো খতিয়ে দেখছি। ভারত সরকার তার স্বার্থ রক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শুধু সরকারই নয়, পাকিস্তান ও ভারতের সাংবাদিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরাও এই চুক্তি নিয়ে মতামত জানাচ্ছেন।

পাকিস্তানের সাংবাদিক তালাত হুসাইন প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের একটি ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, এটি বিপুল সম্পদ এবং শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার একীভূত হওয়ার মতো, এটি একটি গেম চেঞ্জিং সমন্বয়। এর চেয়ে সময়োপযোগী এবং কৌশলগত আর কিছু হতে পারত না।  

দেশটির সাবেক মন্ত্রী মুহিদ হুসাইন সৈয়দ এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবে নীরবে পশ্চিমা বিশ্বকে প্রতিস্থাপন করেছে। এটি তিনটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, কাতারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও আমেরিকার বিশ্বাসঘাতকতার পর স্বাক্ষরিত; দ্বিতীয়ত, বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিন, কাতার, ইরান, লেবানন ও ইয়েমেনে হামলার সময়; তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দক্ষতা প্রদর্শনের পর।  

ভারতীয় সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দার এক্সে লেখেন, কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সংকটের মুখে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। কিন্তু ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর জন্য এর প্রভাব কী হবে?

ভারতীয় নাগরিক তেজস্বী প্রকাশ চুক্তি নিয়ে লেখেন, এক দেশের উপর হামলা অন্য দেশের উপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এটি ইসলামাবাদের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে। মোদী সরকার প্রোপাগান্ডা দিয়ে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরাচ্ছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের প্রভাব কমছে। ”

পারমাণবিক অস্ত্র গবেষক রাবিয়া আখতার বলেন, দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ককে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে এটি আশ্বাস, তবে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়াদকে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে এমন সম্ভাবনা কম।  

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানের জন্য নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ এই চুক্তিকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ট্রিটি বা সন্ধি নয়, এবং পাকিস্তান ও সৌদি আরব ‘ট্রিটি’ এবং ‘অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর মধ্যে পার্থক্য কীভাবে দেখছে তা স্পষ্ট নয়।

খলিলজাদ প্রশ্ন তুলেছেন, এক দেশের উপর হামলাকে অন্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে—এটি কি কাতারে ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়া, নাকি পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রচলিত গুঞ্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যার পেছনে সৌদি অর্থায়ন রয়েছে? 

তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে কোনো গোপন শর্ত আছে কি? থাকলে সেগুলো কী? এটি কি সৌদি আরব বা অন্যান্য দেশের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আস্থায় প্রভাব ফেলবে? পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র ও ডেলিভারি সিস্টেম রয়েছে, যা ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম। তারা এমন সিস্টেমও তৈরি করছে যা আমেরিকায় পৌঁছাতে পারে। প্রশ্ন অনেক।  

আরএইচ

Comments

0 total

Be the first to comment.

জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতকে চিন্তিত হতে হবে: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা Banglanews24 | আন্তর্জাতিক

জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতকে চিন্তিত হতে হবে: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা

জামায়াতে ইসলামীর হাতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রক্ত লেগে আছে উল্লেখ করে বাংলাদেশে হাইকমিশনারের...

Sep 12, 2025
গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে নিহত শতাধিক, নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে মানুষ Banglanews24 | আন্তর্জাতিক

গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে নিহত শতাধিক, নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে মানুষ

ফিলিস্তিনের গাজা শহরে গত দুই বছর ধরে চলমান আগ্রাসনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসর...

Sep 17, 2025
ব্রাজিলে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রে বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড Banglanews24 | আন্তর্জাতিক

ব্রাজিলে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রে বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে সামরিক অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin