পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি, এখন কী করবে ভারত-ইসরায়েল

পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি, এখন কী করবে ভারত-ইসরায়েল

বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য একের পর এক যুদ্ধের বৃত্তে ঢুকে পড়েছে। একের পর এক দেশ আক্রমণের শিকার হয়েছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সব দিক বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছে বিশ্বশক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্র। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নিয়ে তাদের উদ্বেগ কম, আগ্রহের জায়গা প্রাকৃতিক সম্পদ।

কাতারের দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ‘মার্কিন নির্ভরযোগ্যতা’ নিয়ে ক্রমে সন্দেহ বাড়ছে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোহায় হামলার আগে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। যদিও ট্রাম্প পরে তা অস্বীকার করেছেন।

আসল ব্যাপার হলো ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা উপভোগ করে। স্বাভাবিকভাবেই এ সন্ধিক্ষণে সবার নজর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের দিকে। কারণ, ইসরায়েলের এই প্রকল্প খোলাখুলিভাবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ওপর হুমকি তৈরি করেছে।

ফলে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে আরব-মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এ অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপ এবং পাকিস্তানের চিরশত্রু ও বিকাশমান অর্থনৈতিক শক্তি ভারতকে হতবাক করেছে।

সম্প্রতি ভারত যখন ‘ইসরায়েলি ধাঁচের সম্প্রসারণবাদের’ ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ করে, তখন পাকিস্তান কার্যকরভাবে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। কয়েক বছর আগে প্রয়াত ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক মন্তব্য করেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সংঘাতে ইসরায়েল বড় ভূমিকা রাখছে।

এ বছরের শুরুতে তুরস্ক-পাকিস্তান-আজারবাইজানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিটি মুসলিম দেশগুলোতে যে শঙ্কা বাড়ছে তারই প্রতিফলন।

ইসরায়েল ও ভারতের জোট এবং তাদের ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির কারণে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিকে আগ্রাসী পরিকল্পনা হিসেবে নয়; বরং প্ররোচনাহীন হামলার বিরুদ্ধে একটি আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, ছয়টি মুসলিম দেশ বোমা হামলা চালিয়ে এবং মুসলমানদের হত্যা, হত্যাচেষ্টা, বাস্তুচ্যুতি ও স্থায়ীভাবে পঙ্গু করার পর নেতানিয়াহু এখন অভিযোগ তুলছেন—বিশ্বে ইসরায়েল যে ক্রমে নিঃসঙ্গ হয়ে উঠছে, এর জন্য দায়ী চীন, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘আমাদের অস্ত্রশিল্পকে আরও বিকশিত করতে হবে। আমরা একসঙ্গে এথেন্স ও সুপার স্পার্টা হব।’

‘ফিফটি স্টেটস-ওয়ান ইসরায়েল’ শীর্ষক এক বিশাল সমাবেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘জীবনের মূল্য আইনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’। তাঁর এ বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে, সামনে আরও বড় যুদ্ধ অপেক্ষা করছে।

আসলে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের অংশবিশেষ দখল করে নেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও সৌদি আরব। এটি স্বীকার করতেই হবে, এটি নিছক কল্পকাহিনি নয়; বরং ঠেকানো সম্ভব এমন এক বাস্তবতা।

সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধে আমি লিখেছিলাম, ইসরায়েল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মুসলিম দেশ ধ্বংস করছে। পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, মিসর, এমনকি আরও দূরে মধ্যপ্রাচ্যে ভূমি দখলের অভিযানকে সমর্থন করছে। ‘ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে’ কিংবা ‘বিশ্বকে নিরাপদ করা’—এই যুক্তিকে সামনে আনা হচ্ছে। ইসরায়েলের এ মারাত্মক অভিযান কোথায় গিয়ে শেষ হবে? এরপর কোন দেশ—পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর নাকি সৌদি আরব?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু করে ‘দোহা হামলা’ পর্যন্ত ইসরায়েল হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করেছে। একই সঙ্গে ইরান ও ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও হত্যা করা হয়েছে। নেতানিয়াহু ও তাঁর জোটসঙ্গীরা বারবার হুমকি দিয়েছেন যে হামাস নেতারা যেখানেই থাকুক, তাঁদের হত্যা করা হবে।

অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যম, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, প্রধান শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক মনে করছেন, নেতানিয়াহু দোহাতেই থেমে থাকবেন না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রতিটি দেশের নিজের সীমানার বাইরে গিয়েও আত্মরক্ষা করার অধিকার আছে এবং হামাস নেতারা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, তাঁরা দায়মুক্তি পেতে পারেন না।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যে মাইলফলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চুক্তি। এ চুক্তি সৌদি আরবকে নিশ্চিত সুরক্ষা প্রদান করবে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত চুক্তি বলে অভিহিত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এর লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উন্নত করা ও যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ নিবারণ শক্তি বৃদ্ধি করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে, সেটি দুই দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

সৌদি আরব ও পাকিস্তান ১৯৬৭ সালে প্রথম নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ১৯৭৯ সালে মক্কায় হামলার সময় পাকিস্তানি কমান্ডাররা সৌদি বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পবিত্র স্থান রক্ষা করেছিলেন।

সর্বশেষ চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম করা হয়, ‘নাটো ধাঁচের চুক্তি’। টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করেছে, ‘ইসরায়েলের জন্য পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধাক্কা।’

পাকিস্তান-সৌদি আরব চুক্তি দিল্লি ও জেরুজালেমে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হলেও ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ও ‘অখণ্ড ভারত’ প্রকল্পের কারণে বিশ্বশান্তি হুমকির মুখে পড়ার বিষয়ে কোনো উদ্বেগ দেখা যায় না।

বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ও তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি সমর্থন বাড়তে থাকায় নেতানিয়াহুর চরমপন্থী সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিটি প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করছে। সুতরাং এরপর কী হতে যাচ্ছে?

পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি কি দুই দেশের বাইরেও সম্প্রসারিত হবে? ভারত যদি পাকিস্তানের ওপর হামলা করে, তাহলে সৌদি আরব কি করবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সময়ই বলতে পারে।

ইরফান রাজা একজন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Comments

0 total

Be the first to comment.

নেপালের অভ্যুত্থান নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া যেভাবে মিথ্যা বয়ান হাজির করছে Prothomalo | কলাম

নেপালের অভ্যুত্থান নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া যেভাবে মিথ্যা বয়ান হাজির করছে

যখন ২৭ বছর বয়সী নরেশ রাওয়াল টিকটকের ভিডিওতে নেপালের অভিজাত রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের (যাদের ‘নেপো...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin