প্রাণ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর

প্রাণ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর

ঘরের মাঝখানে প্লাস্টিকের ছোট্ট একটি ওয়ারড্রব ছিল। ভেতরে ছিল শিশু কন্যার একটিমাত্র স্বর্ণের চেইন। আগুনে ওয়ারড্রব পুড়ে গড়ে গেছে। সঙ্গে স্বর্ণের চেইনটিও উধাও। কড়াইল বস্তির পঞ্চাশোর্ধ্ব বাসিন্দা মনিক জানকে বুধবার (২৬ নভেম্বর) দেখা গেল ওয়ারড্রব রাখার জায়গায় কাঁচি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চেইনটি খুঁজছেন।

বস্তির অন্য বাসিন্দারা তাকে বার বার বলছেন, চেইনটি পাওয়া যাবে না। কিন্তু তা মানতে রাজি নন মানিক জান। ছাইয়ের মধ্যে খুঁজেই বেড়াচ্ছেন তিনি। তার কাছে চেইনটি যেন বড় সম্পদ।

মানিক জান জানান, দুই সন্তান ও স্বামী-স্ত্রী মিলে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় ভাড়া থাকতেন কড়াইল বস্তির মিন্টু মিয়ার একটি ছোট্ট ঘরে। স্বামী-স্ত্রী শাক তুলে বিক্রি করতেন, কখনও কখনও মাটি কাটেন। কিশোর ছেলে একটি ব্যাংকের ঝাড়ুদার হিসেবে চাকরি করে। অগ্নিকাণ্ডের সময় ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ঘরেই ছিলেন মানিক জান। কিন্তু কিছুই বের করতে পারেননি। পড়নের কাপড় ছাড়া সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

শুধু মানিক জান’ই নন, তার মতো আগুনে সবহারা পরিবারগুলো ছাইয়ের মধ্যে অবশিষ্টাংশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। প্রাণ ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের। বস্তিটির এক অংশ পুড়ে অচেনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একদিন আগেও যেখানে ঘর ছিল, কোলাহল ছিল, আজ সেখানে ঘরের অস্তিত্বই বিলীন। এক কাপড়ে খোলা আকাশের নিচে সন্তানদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের থাকতে হচ্ছে। খাবার সংকটে ভুগছেন তারা।

তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল থেকে রুটি-কলা আর খিচুরি দিয়ে সাময়িক সহায়তা করছে। সাহায্যোর হাত বাড়িয়েছেন ব্যক্তিগতভাবেও কেউ কেউ।

সর্বনাশা আগুনের লেলিহান শিখায় বস্তির ১৫০০ ঘর পুড়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। তবে বস্তিবাসীর দাবি, ২ হাজারের বেশি ঘর পুড়েছে। আগুন লাগার সূত্রপাত সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে বস্তির একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, খেলনা দোকানের মালিক মিন্টু মিয়ার রান্না ঘরের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বস্তিতে।

বস্তির গুদারাঘাটের বউবাজারের কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ‘ক’ ব্লক এলাকায় আগুন লাগে। ওই অংশে  একতলা ও দোতলা সিস্টেমের সেমিপাকা প্রায় দুই হাজারের মতো ঘর ছিল। আগুনে সব ঘর পুড়ে গেছে। শুধুমাত্র খোপ খোপ দেয়াল পড়ে আছে। বস্তির মূল সড়কসহ অলিগলিতে ছিল মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, টেইলার্সের দোকান, খাবার দোকান, ভাঙারিসহ হরেক রকমের দোকান। সবই পুড়ে ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা বলেন, আগুন লাগলে প্রয়োজনীয় জিনিস কেউ ট্রাঙ্কে, কেউ বালতি বা পাতিলে, আবার কেউ পলিথিনে বেঁধে পানির হাউসে ফেলে দেন বা পাশের নিরাপদ স্থানে রাখেন। আগুন নিভে গেলে তা তুলে নেন। এতে অন্তত জরুরি কিছু জিনিস আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

বউবাজারের কুমিল্লা পট্টিতে স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে থাকতেন শান্তি বেগম। টিভি গেট এলাকায় বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন। তার স্বামী একটি চিপস কোম্পানির অফিসের পিয়ন। শান্তি বলেন, “পড়নের কাপড় ছাড়া কোনও কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। সোমবার থেকে এক কাপড়ে আছি। যে যা দেয় তাই খেয়ে আছি। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোন অনুদান দেওয়া হয়নি। ঢাকায় কোনও আত্মীয় নেই যে, তাদের কাছে আশ্রয় নেবা। রাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে পুড়ে যাওয়া ভিটায় থাকতে হবে।”

বস্তির তালতলা রোডে থাকেন ফিরোজ মিয়া। তিনটি কক্ষ নিয়ে পরিবারসহ থাকেন। সামনে চা ও মুদি-মনোহারি দোকান দিয়েছিলেন। এর আয় দিয়েই চালাতেন সংসার। কিন্তু আগুনে তার সব শেষ হয়ে গেছে।

তিনি জানান, চার বছর ধরে এই বস্তিতে স্ত্রি ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। তিন রুমের ভাড়া দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। সামনে একটি দোকান দিয়ে তার আয় দিয়েই সংসারের খরচ মিটতো। কিন্তু আগুন তার সব কেড়ে নিল।

মাস দুয়েক আগেই ব্র্যাক এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন জানিয়ে ফিরোজ বলেন, “দোকান ও বাসায় অন্তত ৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল। যার সবই পুড়েছে। এই দোকান ও ঘর পুরো ঠিক করতে অন্তত ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা লাগবে। কোথায় পাবো এই টাকা।” 

খোলা আকাশের নিচে ক্ষতিগ্রস্তরা

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের কেউ খামারবাড়ি (ঈদগাহ) মাঠে, কেউ এরশাদ স্কুলমাঠ আবার কেউ কেউ মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। খামারবাড়ি মাঠে গিয়ে শতাধিক পরিবারের সদস্যদের মালপত্র নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে দেখা গেছে। পরে টিঅ্যান্ডটি মাঠে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে ছিল ঘর থেকে আনা কিছু মালপত্র ও আসবাব।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত

গুদারাঘাটের বউবাজারের কবরস্থান রোডের (কুমিল্লা পট্টি) ক ব্লকে ২০টি ঘর রয়েছে মিন্টু মিয়ার। সম্প্রতি এক অংশ ভেঙে দোতলা করছিলেন। মাত্র দেয়াল দাঁড় করিয়েছেন। অন্য অংশে একতলা বিশিষ্ট ঘর। ঘরের সামনের অংশে বাচ্চাদের খেলনার দোকান রয়েছে মিন্টু মিয়ার। সেখানে তিনি নিজেই এসবের ব্যবসা করেন। পেছনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দোকানের পেছনের ঘরটিতে থাকেন।

ঘরটির আশপাশের বাসিন্দারা জানান, সোমবার মাগরিবের আজানের আগে মিন্টু মিয়ার রান্নাঘরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। তখন উপস্থিত লোকজন পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সিলিন্ডারের আগুনে পানি ছিটানোর ফলে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তবে মিন্টু মিয়ার মেয়ে আছমা জানান, তাদের ঘরের পাশে তিন তলা বিশিষ্ট ঘরে প্রথমে আগুন লাগে। সেই আগুন থেকে তাদের ঘরে আগুন লাগে। এরপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে তার হোসনে আরা নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তবে আশপাশের বাসিন্দারা আছমার এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। তারা জানান, আছমাদের ঘর থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এখন তারা স্বীকার করছে না। ঘটনার পর থেকে তার মা ইচ্ছা করে আত্মগোপনে রয়েছেন।

মিন্টু মিয়ার ঘরের আশপাশে থাকা দোকানিরাও জানিয়েছেন, মিন্টু মিয়ার ঘর থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসও জানিয়েছে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

বুধবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত পুড়ে যাওয়া বস্তি ঘুরে দেখা যায়, বস্তির প্রবেশ মুখগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। বেলা ১১টার দিকে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন নজরুল ইসলাম। চারিদিকের বাতাস এখনো ভারী। পোড়া গন্ধটা যেন কড়াইল বস্তির প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে। সকালে সূর্যের আলো ফুটতেই স্পষ্ট হয়েছে ধ্বংসের এক বীভৎস চিত্র। সেখানে জীবনের কোনও রং নেই, আছে শুধু ছাই আর হাজারো মানুষের বুকফাটা হাহাকার। মঙ্গলবারও যেখানে ছিল সারি সারি টিনের ঘর, সেখানে কেবলই পোড়া স্তূপ। বাঁশ, কাঠ আর টিনের ভাঙা টুকরোগুলো একাকার হয়ে আছে মাটির সঙ্গে। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো বাসা বাধা ছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে এই ধ্বংসস্তূপ সরাতে দেখা গেছে। কেউ নীরবে, কেউবা বিলাপ করতে করতে এই কাজ করছিলেন। তারা ছাইয়ের মধ্যে খুঁজে দেখছিলেন তাদের মুল্যবান সামগ্রী পাওয়া যায় কি না।

রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা

বস্তির সবাই নিন্ম আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করেন, কেউবা দিনমজুরের কাজ করেন। এছাড়া আগুনে বাসায় থাকায় চাল-ডাল থেকে শুরু করে সবই পুড়ে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খাদ্যাভাবে ভুগছেন। এ অবস্থায় কিছুটা হলেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা। 

পুড়ে যাওয়া বস্তি ঘুরে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের পক্ষ থেকে খিচুরির প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে। পারটেক্স গ্রুপের পক্ষ থেকে খাবার পানি ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও খাবার বিতরণ করেন। সহকর্মীদের নিয়ে খিচুরি বিতরণ করেন ল্যান্ড মার্ক গ্রুপের সিইও বিএম সাইফুদ্দিন।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw69273da155a5f" ) );

এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে আরও অনেককে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। অসহায় বস্তিবাসীর এই খাবারই একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল।

দেখা যায়, ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামানের ব্যানারে পোড়া বস্তির দুই স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। সেখানে বস্তির আহত বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন কয়েকজন চিকিৎসক। এছাড়া জরুরি ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।

এছাড়া সমাজসেবা অধিদফতর, ব্র্যাক ও বেশ কয়েকটি এনজিও কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের তালিকা সংগ্রহ করেছেন।

জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদফতরের একটি প্রকল্পের ফিল্ড কর্মী মোসাম্মদ রাবেয়া খাতুন বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে, তাদের তালিকা করা হচ্ছে। অধিদফতরে চলমান প্রকল্প থেকে শিশুদের কীট বক্স, বয়স অনুযায়ী পোশাক, জুতা, ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin