ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ২৩৭ আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বাকি ৬৩টি আসনের মধ্যে ২৩টি দলের ও ৪০টি আসন বিগত দিনে আন্দোলনের সহযোগী দলগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সোমবার (৩ নভেম্বর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকের মধ্য দিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।
তালিকা ঘোষণার সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘প্রার্থী ঘোষিত আসনেও পরিবর্তন আসতে পারে।’ তবে নির্বাচন ‘হওয়া-না হওয়া’ নিয়ে যেখানে নানামুখী আলোচনা হচ্ছে, সেখানে তফসিলের আগেই প্রার্থী ঘোষণার কারণ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো মনোনয়নকেন্দ্রিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে জানাচ্ছে, অন্তত চারটি কারণে প্রার্থীদের একক তালিকা প্রকাশ করেছে বিএনপি। এমনকি সম্ভাব্য আরও একজন করে প্রায় প্রতিটি আসনেই বিকল্প রয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বেশ আগে এই তালিকা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য, যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাকে সুযোগ দেওয়া।
বিএনপির দায়িত্বশীল ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, চারটি কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে, মনোনীতরা যেন এই সময়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং কমিয়ে নিজের জায়গা কতটুকু পাকাপোক্ত করতে পারেন। দ্বিতীয় হচ্ছে, দল থেকে সম্ভাব্য বিকল্প প্রার্থী কী করেন; তার আচরণ কী; তার সাংগঠনিক অবস্থান কেমন তা দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট আগ্রহী কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও খেয়ালে রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মনোনীত প্রার্থীর ত্রুটি ধরা পড়লে চূড়ান্ত মনোনয়নে দ্বিতীয় বিকল্প সামনে আসতে পারেন।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে মনোনীত প্রার্থী ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মান–অভিমান ভুলে সবাইকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। আমাদের দলের কাউকে আমি মিষ্টি বিতরণ বা ভি চিহ্ন প্রদর্শন করা, এসবে নিরুৎসাহিত করেছি।”
তৃতীয় কারণটি হলো, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশ ফেরার আগেই জটিল বিষয়টিকে সামনে আনলেন। তিনি দেশে ফিরে দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখতে চান না, এ কারণে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করলো বিএনপি। যদিও এখনও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের অভ্যন্তরে নানা প্রস্তুতি থাকলেও দিনক্ষণ এখনও অজানা।
এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় এক সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তারেক রহমান দেশে ফিরে সারাদেশে সফর করবেন। আর তার সফরের মূল কারণই ধানের শীষকে ক্ষমতায় আনা। এই লক্ষ্যে আগে প্রার্থী ঘোষণা করে তাদের বর্তমান অবস্থা দেখা, সুযোগ দেওয়া, বিকল্প নেতাদের প্রস্তুত করাও লক্ষ্য। কারও মধ্যেই কোনও খারাপ কিছু দেখলে তিনি বিকল্প সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন।”
দলীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই, বিশেষ করে শামসুজ্জামান দুদু, আব্দুস সালাম, আসাদুজ্জামান রিপন, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, রুমিন ফারহানাসহ আলোচিত অনেক নেতা মনোনীত হননি। তাদের ক্ষেত্রেও বিএনপির পরীক্ষা রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
আরেকটি কারণ হিসেবে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, সরকারকে নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে বিএনপির কৌশলের অংশ হিসেবেও দ্রুত প্রার্থী ঘোষণা। নির্বাচন থেকে যেন সরকার পিছপা না হয়, সব দলই যেন নির্বাচনমুখী থাকে, সেদিক বিবেচনা করে প্রার্থী তালিকা আগেই জানালো বিএনপি।
একটি ইসলামি দলের প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিএনপির নির্বাচনের জন্য সরকারকে চাপে রাখতেই তালিকা প্রকাশ করেছে। এছাড়া বিগত বহুবছর ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট করতে পারেনি বিএনপি। প্রার্থীদের আগেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হলো।”
বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীর তালিকা দেখে যুগপতে যুক্ত অনেক নেতাই খুশি, কেউ মনঃক্ষুণ্ন। অনেকে তাদের প্রত্যাশামাফিক আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা দেখে বিচলিতও। যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, যুগপতে যুক্তদের নিয়ে বিএনপি সর্বোচ্চ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এমনকি ভোটের পর সরকার গঠনেও সব দলকে যুক্ত করার পক্ষে শীর্ষ নেতৃত্ব।
জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যুগপৎ আন্দোলনে যারা যারা যুক্ত ছিলেন, দল-জোট আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করবো।”
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, “বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলের একাধিক জরিপ ও ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য ২৩৭ সংসদীয় আসনের প্রার্থী নির্ধারণ করেছেন। বিএনপি পক্ষ থেকে বিএনপি স্থায়ী কমিটি (পার্লামেন্টারি বোর্ড) বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থায়ী কমিটি সদস্যদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন।”