যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার ফি আকাশচুম্বী হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিভা আকর্ষণের লক্ষ্যে নতুন ভিসা কর্মসূচি চালু করেছে চীন। এই সপ্তাহে কার্যকর হওয়া ‘কে’ ভিসা বেইজিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনে দক্ষ স্থানীয় প্রকৌশলীর অভাব নেই। তবু বিদেশি বিনিয়োগ ও মেধাবীদের জন্য দেশকে আরও উন্মুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবাণিজ্য নীতির কারণে অর্থনৈতিক দিগন্ত ম্লান হয়ে ওঠায় চীন সম্প্রতি একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন- বিনিয়োগের জন্য আরও খাত খুলে দেওয়া, ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের জন্য ভিসা ছাড় দেওয়াসহ নানা উদ্যোগ তার মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়াভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী ম্যাট মাউনটেল-মেডিসি বলেন, প্রতীকী দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাধা তৈরি করছে, আর চীন সেই বাধা কমাচ্ছে।
‘কে’ ভিসার বৈশিষ্ট্য
‘কে’ ভিসা মূলত তরুণ বিদেশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) স্নাতকদের লক্ষ্য করছে। এই ভিসায় চাকরির অফার ছাড়াই প্রবেশ, বসবাস ও কর্মসংস্থানের অনুমতি থাকবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগের বিকল্প খুঁজতে থাকা বিদেশিদের কাছে এটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, চলতি মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, কোম্পানিগুলোকে এখন থেকে এইচ-১বি ভিসার জন্য বছরে ১ লাখ ডলার ফি দিতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগে এই ভিসা ব্যবহার করে থাকে।
জিওপলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজির প্রধান কৌশলবিদ মাইকেল ফেলর বলেন, এইচ-১বি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকেই আঘাত করেছে। আর কে ভিসার জন্য সময়টা একদম উপযুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কে ভিসার প্রধান সুবিধা হলো- এতে কোনো স্পনসরিং নিয়োগকর্তার প্রয়োজন নেই। অথচ এইচ-১বি ভিসায় কেবল ৮৫ হাজার স্লট বরাদ্দ থাকে ও তা লটারির মাধ্যমে দেওয়া হয়। আবার নতুন ১ লাখ ডলারের ফি অনেক আবেদনকারীকে নিরুৎসাহিত করবে।
ভারতের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিকাশ কালি দাস বলেন, এটি ভারতীয় এসটিইএম পেশাজীবীদের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প, যারা আরও নমনীয় ভিসা চান। উল্লেখযোগ্য যে, গত বছর অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার ৭১ শতাংশই ভারতীয়রা পেয়েছিলেন।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
তবে কে ভিসার সামনে নানা প্রশ্নও আছে। চীনা সরকারের নির্দেশনায় অস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কাজের অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তার কথা। আর্থিক সুবিধা, স্থায়ী আবাসনের সুযোগ বা পারিবারিক স্পনসরশিপ নিয়েও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীন বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেয় না, কেবল বিরল ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। ভাষাগত বাধাও একটি বড় সমস্যা, কারণ বেশিরভাগ চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি ‘মান্দারিন’ ভাষায় পরিচালিত হয়।
ভারত-চীন রাজনৈতিক টানাপোড়েনও ভারতীয় আবেদনকারীর সংখ্যা সীমিত করতে পারে। ফেলর বলেন, ভারতীয়দের স্বাগত জানাতে হবে ও মান্দারিন না জেনেও যেন তারা অর্থবহ কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে চীনকে।
কাদের জন্য এই ভিসা?
চীনের মেধা নিয়োগ নীতি ঐতিহ্যগতভাবে বিদেশে থাকা চীন-জন্ম বিজ্ঞানী ও প্রবাসী চীনা নাগরিকদের ঘিরেই থেকেছে। তাদের জন্য বাড়ি কেনার ভর্তুকি ও ৫০ লাখ ইউয়ান (৭ লাখ ২ হাজার ডলার) পর্যন্ত বোনাসের মতো সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অনেক চীনা এসটিইএম পেশাজীবী দেশে ফিরে আসছেন, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের বাড়তি নজরদারির কারণে।
তবে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিভা টানার প্রচেষ্টা এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের দাস বলেন, চীন-জন্ম মেধাবীদের ফেরাতে যতটা শক্তিশালী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ভারতীয়দের জন্য ততটা নয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া চীনা এসটিএম কর্মী বলেন, চীন অভিবাসনের ওপর ভর করে না। স্থানীয় প্রতিভা টানতে বহু উপায় আছে। তাই কে ভিসার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ৫ কোটি ১০ লাখেরও বেশি অভিবাসী রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ। সেই তুলনায় চীনে বিদেশির সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ, যা জনসংখ্যার ১ শতাংশও নয়। ফলে চীন অভিবাসন নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না।
তবু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কে ভিসা চালু হলে বিশ্ব প্রযুক্তি প্রতিভার সামান্য অংশ টানতে পারলেও চীন উন্নত প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। ফেলর বলেন, চীন যদি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিভার অল্প অংশও আকর্ষণ করতে পারে, তবে তা তাদের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ