পশ্চিমাদের স্বীকৃতিতে ফিলিস্তিনের বাস্তবতা বদলাবে?

পশ্চিমাদের স্বীকৃতিতে ফিলিস্তিনের বাস্তবতা বদলাবে?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলো যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য এক বড় কূটনৈতিক মাইলফলক। তবে বাস্তবে দুই রাষ্ট্র সমাধান যে এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আরও দূরে সরে গেছে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রায় ঐকমত্যই দেখা যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানিয়েছে।

স্বীকৃতির ঢেউ

রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই তিন জি-সেভেন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও কানাডা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেরও স্থায়ী সদস্য। ফ্রান্সও এ সপ্তাহে জাতিসংঘ অধিবেশনে একই পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর আগে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামও এমন ঘোষণা দিয়েছে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এক প্রতীকী শক্তি যোগ করেছে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে।

তবে লন্ডনভিত্তিক চ্যাথাম হাউজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ওসলো চুক্তির পর তিন দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আজ সবচেয়ে কম। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সম্পর্কের অবস্থা ১৯৪৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ।

বসতি সম্প্রসারণে হারিয়ে যাচ্ছে দুই রাষ্ট্র সমাধান

জাতিসংঘ পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজাকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাস্তবে এই অঞ্চলগুলো টুকরো টুকরো খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রায় সাত লাখ ইসরায়েলি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে যেগুলো অবৈধ।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি সরকার ক্রমাগত নতুন বসতি অনুমোদন করছে। বিতর্কিত ই-১ প্রকল্প আবারও চালু করা হয়েছে, যা কার্যত পশ্চিম তীরকে দুই টুকরো করে ফেলবে। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ সরাসরি বলেছেন, নতুন বসতি গড়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকেই কবর দেওয়া হচ্ছে।

শান্তির প্রচারকারী সংগঠন পিস নাউ-এর নির্বাহী পরিচালক লিওর আমিহাই সতর্ক করে বলেন, প্রতি সপ্তাহে নতুন অবৈধ আউটপোস্ট তৈরি হচ্ছে, নতুন রাস্তা হচ্ছে। বাস্তবে সংযুক্তিকরণ শুরু হয়ে গেছে। সহিংসতা বেড়েছে, অনেক ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় উৎখাত হচ্ছে। সেনা ও পুলিশের নীরব সমর্থনে এই সহিংসতা বাড়ছে।

গাজায় ধ্বংসস্তূপ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের অনুসন্ধান কমিশন পর্যন্ত বলছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। সাবেক এক ইসরায়েলি সেনাপ্রধানের হিসাবে, গাজায় প্রতি দশজনের একজন নিহত বা আহত হয়েছেন। সংখ্যাটি দুই লাখ ছাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন এই স্বীকৃতিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, এটি ‘সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত’ করার শামিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জুটি ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। বিশ্বে এখন ১৪০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মধ্যে পশ্চিমা দেশের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

রিপাবলিকান নীতিনির্ধারক এলিয়ট অ্যাব্রামস মনে করেন, এসব সিদ্ধান্ত মূলত পশ্চিমা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে এসেছে। তার মতে, এতে ফিলিস্তিনিদের বাস্তবিক কোনও উপকার হবে না।

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক জুলি নরম্যান মনে করেন, ইসরায়েলি সরকারের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানই যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সের মতো দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল যতক্ষণ দখল বজায় রাখবে, ততক্ষণ প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। এ কারণেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক চাপ ও সীমাবদ্ধতা

স্বীকৃতির পর আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট কিছু দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আরদি ইমসেইস বলেন, স্বীকৃতির পর রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আত্মরক্ষার অধিকারকে সম্মান জানাতে হয়। ইসরায়েল বর্তমানে এই তিনটি ক্ষেত্রেই লঙ্ঘন করছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতীকী স্বীকৃতির বাইরে বাস্তবে কিছু হবে কি না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ইউরোপ চাইলে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক চাপ দিয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সম্প্রতি কিছু সহিংস ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। আবার ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনার কথাও উঠেছে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

স্বীকৃতির ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপরও নতুন দায়িত্ব এসেছে। মেকেলবার্গ বলেন, আপনি যদি রাষ্ট্র হন, তবে আলাদা ধরনের আচরণ করতে হবে। দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।

যদিও বাস্তবে আজকের পশ্চিম তীর বা গাজার পরিস্থিতি দেখে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কল্পনা করাই কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বীকৃতি অন্তত প্রতীকী বার্তা দিয়েছে যে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো আর দেরি করতে চাইছে না।

ফলে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রতীকী বার্তা কি বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ নেবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আরও দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় বন্দি থাকবে?

Comments

0 total

Be the first to comment.

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল? BanglaTribune | মধ্যপ্রাচ্য

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin