ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের সিদ্ধান্তে তার ছোট ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ‘রাজকীয় উপাধি’ বাতিল করা হয়েছে। বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, তিনি আর ‘প্রিন্স’ নন। এখন থেকে তার পরিচয় হবে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্যালেস জানিয়েছে, রাজা চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যান্ড্রুর ‘স্টাইল, টাইটেল ও অনার’ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এর ফলে অ্যান্ড্রু প্রিন্স, ডিউক অব ইয়র্ক, আর্ল অব ইনভারনেস ও ব্যারন কিলিলেয়ার খেতাবসহ রাজ সম্মাননা হারাচ্ছেন।
অ্যান্ড্রুর এই পতন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাজ প্রাসাদ রয়্যাল লজ-এর লিজ সমাপ্ত করা হয়েছে এবং অ্যান্ড্রুকে বিকল্প ব্যক্তিগত বাসস্থানে যেতে বলা হয়েছে। তিনি খুব শিগগিরই নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে স্থানান্তরিত হবেন। প্যালেসের ভাষায়, অভিযুক্ত ঘটনাগুলো অস্বীকার করলেও এসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে।
রাজপরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের চিন্তা ও সহানুভূতি বরাবরই ভুক্তভোগীদের প্রতি থাকবে।
রাজকীয় ইতিহাসবিদ কেলি সোয়াবি বলেন, বিবৃতির ভাষা অত্যন্ত কঠোর। জনমনে অ্যান্ড্রুর প্রতি ক্ষোভ প্রবল, এবং প্যালেসের ভাষা সেটাই প্রতিফলিত করেছে।
বিবিসির সাবেক রাজকীয় সংবাদদাতা জেনি বন্ড বলেন, রাজা চার্লস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন রাজপরিবারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে। তিনি ধারণা করছেন, উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়ামই এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছেন। ব্রাজিলে উইলিয়ামের সফর সামনে। অ্যান্ড্রুকে ঘিরে বিতর্ক সেই সফরকে প্রভাবিত করতে পারত।
অ্যান্ড্রুর সাবেক স্ত্রী সারা ফার্গুসনকেও রয়্যাল লজ ছাড়তে হবে। তিনি ইতোমধ্যে ডাচেস অব ইয়র্ক উপাধি হারিয়ে নিজ নাম ‘সারা ফার্গুসন’ ব্যবহার করছেন। তাদের দুই মেয়ে, প্রিন্সেস বিয়াট্রিস ও প্রিন্সেস ইউজেনি, রাজকুমারী উপাধি বহাল রাখবেন। কারণ তারা রাজপরিবারের উত্তরসূরির কন্যা।
অ্যান্ড্রুর নতুন বাসস্থানের ব্যয় রাজা নিজেই বহন করবেন বলে জানা গেছে। তবে সরকারি অর্থ ব্যবহার নিয়ে পার্লামেন্টের ব্যয়ের তদারকি কমিটি ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। তারা রাজকীয় সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে অ্যান্ড্রুর ভবিষ্যৎ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
রাজা চার্লস লর্ড চ্যান্সেলরকে রাজকীয় আদেশ পাঠিয়ে অ্যান্ড্রুর উপাধি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। অ্যান্ড্রু এতে কোনও আপত্তি জানাননি।
অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবুও রাজপরিবার মনে করছে, তার আচরণে ‘গুরুতর বিচারের ভুল’ হয়েছে।
সম্প্রতি পুরোনো ইমেইল প্রকাশিত হয়েছে যেখানে দেখা গেছে, ২০১১ সালেও অ্যান্ড্রু এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এপস্টিনের এক ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া গিউফ্রে দাবি করেছেন, কিশোরী বয়সে তাকে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তিনবার যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। এই অভিযোগই তার পতনের সূচনা করে।
ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু লাউনি বলেন, রাজপরিবার অবশেষে পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু এই কেলেঙ্কারি এখানেই শেষ নয়। জনমতের ক্ষোভ এত গভীর যে এটি পুরো পরিবারকেই দীর্ঘদিন তাড়া করবে।
গণতন্ত্রপন্থি সংগঠন রিপাবলিক-এর প্রধান গ্রাহাম স্মিথ বলেন, এটি শুধু পারিবারিক ব্যাপার নয়; রাজপরিবারের জানা উচিত ছিল অ্যান্ড্রুর কার্যকলাপ সম্পর্কে। তাই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া জরুরি।