রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া গণতন্ত্র টিকবে না: সেমিনারে বক্তারা

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া গণতন্ত্র টিকবে না: সেমিনারে বক্তারা

বাংলাদেশে রাজনীতি এখন ক্রমশ জনসেবার প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হয়ে উঠছে— ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্বেষণ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে বক্তাদের পর্যবেক্ষণ এমনটাই উঠে এসেছে। ঢাকা ট্রিবিউনের আয়োজনে এবং ঢাকার নরওয়ে দূতাবাসের সহযোগিতায় এই সেমিনারটি গত ৪ নভেম্বর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের মিডিয়া পার্টনার ছিল বাংলা ট্রিবিউন।

সেমিনারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংস্কারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার জন্য একত্রিত হয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, তরুণ প্রজন্ম, রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষাবিদরা। আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবজাগরণ কেবল সনদ, কমিশন বা সাংবিধানিক সংশোধনের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে আস্থা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক নেতৃত্বের ওপর।

আলোচকদের বার্তাটি ছিল স্পষ্ট— গণতন্ত্র কেবল কোনও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিকে থাকে না, এটি টিকে থাকে সংস্কৃতির মাধ্যমে— অর্থাৎ রাজনীতির নৈতিক চর্চার মাধ্যমে।

সেমিনারটি পরিচালনা করেন, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ। সেমিনারের উদ্দেশ‍্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটি একটি বৃহত্তর সিরিজ আলোচনার অংশ, যার উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক সংস্কার, সুশাসন এবং নাগরিক নবজাগরণ নিয়ে আলোচনা করা।’’

অনুষ্ঠানের শুরুতেই নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হিকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, ‘‘আমার মতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার শুরু করলেও, দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর।’’

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. রওনক জাহান বলেন, ‘‘আচরণগত পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক সততা— এই দুইটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।’’

রাষ্ট্রদূত হিকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন তার সমাপনী বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন, “সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেবল আইন দিয়ে গড়ে ওঠে না, এটি গড়ে ওঠে রাজনীতিক চর্চার মাধ্যমে।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1708" ) ); হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন

ঢাকায় নরওয়ের রাষ্ট্রদূত

“নরওয়েতে নির্বাচনি প্রচারণার সময় প্রার্থীরা একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। কারণ রাজনীতি ব্যক্তিগত নয়, এটি জনসেবা। বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা আছে এবং একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেবে।”

তিনি বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সরকার কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, যারা বেশ কিছু সংস্কার সুপারিশ করেছে। কিছু সংস্কার কাজ ইতোমধ্যে করা হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার আরও সংস্কার কাজ করবে। এসব সংস্কারের বাইরে আরেকটি বিষয়ে সংস্কারের কথা ভেবে দেখতে হবে। সেটা হচ্ছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি।’’

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘‘ভালো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছাড়া বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবণতা, সাংঘর্ষিক রাজনীতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।’’

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1751" ) ); ড. রওনক জাহান

ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

“নাগরিকদের কাছে রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা কেবল পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। জবাবদিহি থাকতে হবে শাসনব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে—নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত।”

ড. জাহান সতর্ক করে বলেন, ‘‘অবারিত বিশেষাধিকার ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং গণতন্ত্রের ওপর জনগণের আস্থা নষ্টকরেছে।’’

তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে জনগণের আস্থার ওপর এক বড় ধাক্কা।”

তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানান, ব্যক্তিনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতার দিকে যেতে।

তিনি মনে করেন, “দলগুলোকে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে সরে এসে নীতি নিয়ে বিতর্কে যেতে হবে। নারী, সংখ্যালঘু ও কম সম্পদসম্পন্ন প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, কোনও অনুদান নয়— এটাই গণতন্ত্র।”

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “এত সবকিছুর পরেও মানুষের গণতন্ত্রে বিশ্বাস এখনও অটুট। সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”

  jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1780" ) );

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান

গবেষণা পরিচালক, ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা)

“বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে জাতীয় ও বৈশ্বিক— উভয় প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশ্বজুড়ে আমরা পপুলিজম ও বৈষম্যের উত্থান দেখছি, আর এই প্রবণতাগুলো আমাদের নিজস্ব রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে।”

আসাদুজ্জামান তার বক্তব‍্যে ব্যাখ্যা করেন কীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা, সহিংসতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে শূন্য করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা এখন রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার গভীর সংকটে আছি— যা গণতন্ত্রকেই দুর্বল করছে। রাজনৈতিক দল, আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে এমন এক পারস্পরিক নির্ভরতার জাল তৈরি হয়েছে, যেখানে জবাবদিহির জায়গা খুবই সীমিত।”

তিনি যুক্তি দেন যে, এই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য নাগরিক শিক্ষা ও জনগণের অংশগ্রহণের এক নতুন ভিত্তি তৈরি করা অপরিহার্য।’’

তার মতে, “আমরা পৃষ্ঠপোষকতা ও ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র গড়ে তুলতে পারবো না। স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া নিয়ন্ত্রণের এই চক্র চলতেই থাকবে। টেকসই গণতন্ত্র কেবল জনগণের নেতৃত্বে ক্ষমতায়ন, নাগরিক শিক্ষা, এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea17aa" ) ); ব্যারিস্টার শিশির মনির

সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

“বাংলাদেশে রাজনীতি এখন সবচেয়ে বড় জীবিকার অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক টিকে থাকা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এতটাই পরস্পর জড়িত হয়ে গেছে যে, নেতৃত্বকে এখন অনেক সময় জনসেবার দায়িত্বের বদলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়।”

তিনি বলেন, ‘‘কর্তৃত্বকে এখন অধিকারের প্রতীক আর নেতৃত্বকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দূষিত করছে।”

‘জুলাই সনদের’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এটি নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি কাঠামো দিয়েছে। এটি যদি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সূচনা হতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির স্বার্থে কাজ করে, সেখানে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। টেকসই সংস্কারের জন্য সব রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার অপরিহার্য।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea17d3" ) );

ডা. জাহেদ উর রহমান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক

“বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী ধাপ হতে পারে আরও উগ্রধর্মীয় সংগঠনের উত্থান। আমরা যা দেখছি, তা শুধু শাসনব্যবস্থার সংকট নয়—বরং সাম্প্রদায়িকতা ও বর্জনের দিকে এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।”

জাহেদ ২০১৮ পরবর্তী সময়কে বর্ণনা করেন, “একটি ক্লাসিক ‘মাফিয়া শাসনব্যবস্থার উদাহরণ’ হিসেবে। তার মতে, বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে এমন এক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যা বৈধতার বদলে আনুগত্যের প্রতি ঝুকেছে, ভয় দ্বারা যা টিকে আছে।’’

তিনি বলেন, “গণতন্ত্র প্রায়ই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই মৃত্যু বরণ করে। নির্বাচিত সরকারগুলো সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে তোলে। ফলে আমরা যে গণতন্ত্র দেখছি, তা কেবল এক প্রকার ভ্রম— যার ভেতরে কোনও সারবস্তু নেই।”

তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক সমাজের সুরক্ষার আহ্বান জানান— যা ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

তার মতে, “সমষ্টিগত সতর্কতা ছাড়া কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রের মুখোশ পরে টিকে থাকবে। এই দায়িত্ব কেবল রাজনীতিবিদদের নয়— নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকেও স্বচ্ছতা ও সঠিক দাবি করতে হবে।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea17fb" ) ); জায়মা ইসলাম

সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার

জুলাই বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক সংস্কারের নতুন আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ৮৮ জন এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়— এগুলো আমাদের রাজনৈতিক জীবনে সহিংসতা কতটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে তা তুলে ধরে।”

তিনি বলেন, “দুটি বড় দলই কেন্দ্রীভূত, অসহিষ্ণু এবং ভিন্নমতের প্রতি অনাগ্রহী। তবুও তৃণমূল পর্যায়ে সহযোগিতার মানসিকতা এখনও টিকে আছে— যা আশাব্যঞ্জক, কারণ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি সেখান থেকেই পুনর্গঠিত হতে পারে।”

তিনি আরও তুলে ধরেন, কীভাবে সংবাদমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়ন গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশের কারণে আইনি হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন। ভয়, প্রতিশোধ ও নীরবতার পরিবেশে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে— এটাই হতে হবে যেকোনও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মূলভিত্তি।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1820" ) );

 ড. মির্জা এম হাসান

উপদেষ্টা, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)

“বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট কেবল দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত নয়, বরং সেই সামাজিক মানদণ্ড থেকেও উদ্ভূত যা অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণকে টিকিয়ে রাখে। রাজনীতি এখনও একটি কৌশল ও অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্র হিসেবে থেকে গেছে, যেখানে দরিদ্রদের অর্থবহ অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়।”

ড. হাসান মনে করেন যে, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী কাঠামোর অভাবের কারণে অভিজাতরা জনসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি ছাড়া আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, “গণতন্ত্র ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। এটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান এবং স্পষ্ট নিয়মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে। এগুলো ছাড়া অংশগ্রহণ কেবল প্রতীকী থাকে এবং পরিবর্তন হয় শুধুই বাইরের দৃষ্টিতে।”

তিনি নাগরিক শিক্ষা, সংলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

“শুধুমাত্র তখনই গণতন্ত্র কেবল বেঁচে থাকার পর্যায়ে থেকে বাস্তব ও কার্যকরী রূপে উত্তীর্ণ হতে পারে, যখন নাগরিকরা তাদের অধিকার বুঝবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্মান করবে।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1847" ) );

ড. আসিফ এম শাহান

অধ‍্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

“বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও একটি ‘ক্ষমতা যার সবকিছু তার’ সংস্কৃতির মধ‍্যে আছে, যেখানে লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রণ অর্জন, জনসেবা নয়। সংস্কার কেবল ‘ভালো মানুষ’ খুঁজে বের করার ওপর নির্ভর করতে পারে না বরং সেই ব্যবস্থাগুলো ঠিক করতে হবে, যা খারাপ ফলাফল তৈরি করে।”

ড. শাহান বলেন, ‘‘এই সংস্কৃতি ইতিহাসগত, যা কেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা এবং পৃষ্ঠপোষকতা-ভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত।’’

তিনি বলেন, “একটি ‘ভালো’ রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, তবে আমাদের ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ, দুর্বল তদারকি ও ভারসাম্য এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে শাসনের অভাবকে চিহ্নিত করা যায়।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘‘টেকসই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যা ব্যক্তির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।’’ “রাজনীতি অবশ্যই জনসেবা প্রদানের ওপর কেন্দ্রিভূত হতে হবে, নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়। জবাবদি একটি অধিকার হিসেবে দাবি করা উচিত, উপকার হিসেবে নয়। আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোকে ন্যায্যতাকে পুরস্কৃত করতে হবে, আনুগত্যকে নয়।”

  jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea186c" ) );

মাহমুদা হাবিবা

সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল

“বাংলাদেশে রাজনীতি এখন সামাজিক সুরক্ষার বিকল্পে পরিণত হয়েছে। যখন আনুগত্য জীবিকার নির্ধারক হয়, তখন নীতি হারিয়ে যায়। রাজনীতি কখনও বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে পারে না, এটি হতে হবে জনসেবার জন্য।”

হাবিবা জোর দেন যে, সংস্কার কোনও এককালীন প্রকল্প নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কার অবশ্যই ধারাবাহিক হতে হবে, প্রতিক্রিয়াশীল নয়। অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি কোনও স্লোগান নয়, এটি দল, নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে একটি যৌথ দায়িত্ব।”

তিনি নারীদের ও তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “সত্যিকারের গণতান্ত্রিকীকরণ তখনই আসবে যখন নাগরিকরা রাজনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে নয়, জনসেবার মাধ্যম হিসেবে দেখবে। নারীদের এবং তরুণদের শাসনের ভবিষ্যৎ গঠনে সত্যিকারের কণ্ঠ থাকতে হবে।”

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6919c84ea1892" ) );

রিয়াজ আহমেদ

সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন

‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্বেষণ’— শিরোনামটি ভারী শোনাতে পারে, তবে জুলাই বিপ্লবের এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, যখন দেশ একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা বিশ্বাস করি— এটি নিশ্চিত করার সঠিক মুহূর্ত যে, বাংলাদেশের মানুষ একটি উন্নত গণতন্ত্র পাওয়ার অধিকার রাখে।’’

তিনি বলেন, ‘‘এটি অর্জন করতে হলে আমাদের প্রথমে অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে এবং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে— যা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রসারিত করে।’’

তার মতে, ‘‘এটি কোনও এক যুগ বা এক দলের ওপর অন্য দলের আধিপত্যের বিষয় নয়। এটি আরও গভীর— গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ভিত্তি করে একটি সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে প্রভাবিত করেছে ‘উইনার-টেকস-অল’ মানসিকতা, ভিন্নমতের জন্য সীমিত জায়গা, গভীর শত্রুতা, অসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এমন গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রথাগুলো পিছে ফেলে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আমরা আশা করি, আজকের আলোচনাগুলো কিছু গভীর পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশ দেবে—একটি রোডম্যাপ, যা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।’’

সুতরাং, এই প্যানেলের সামনে যে প্রশ্নটি তা হলো— আমরা কিভাবে উন্নত রাজনৈতিক চর্চা প্রচার করবো এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য আমরা কী পদক্ষেপ নিতে পারি?”

আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মূল সুপারিশগুলো  

১. রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করতে হবে জনসেবামুখী হিসেবে, পৃষ্ঠপোষকতা বা নিজ লাভের জন্য নয়।

২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

৩. নির্বাহী, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের মধ্যে তদারকি ও ভারসাম্য শক্তিশালী করতে হবে।

৪. নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের জায়গা রক্ষা করতে হবে।

৫. শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে।

৬. আন্তদলীয় আচরণবিধির মাধ্যমে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

৭. নারীর, তরুণ ও সংখ্যালঘু ও অবহেলিত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্বকে উৎসাহিত করতে হবে।

৮. সংস্কার কমিশনগুলোকে স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

৯. রাজনৈতিক চর্চা ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণে গণতান্ত্রিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

১০. সংস্কারের গতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় সংলাপকে উৎসাহিত করতে হবে।

ছবি: আহাদুল করিম খান

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin