রাজউকের ব্যর্থতা-দুর্নীতির কারণে বেড়েছে ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি

রাজউকের ব্যর্থতা-দুর্নীতির কারণে বেড়েছে ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি

নরসিংদীতে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। এই কম্পনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। এর মাধ্যমে আবারও প্রকাশ হয়েছে রাজধানী ঢাকার ভয়াবহ ভঙ্গুর অবস্থা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পনের কারণে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন আরও অন্তত সাড়ে ৩০০ মানুষ। ফাটল দেখা দিয়েছে বহু ভবনে। কয়েকটি হেলেও পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পটি আরও শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী ঘটনার পূর্বাভাস হতে পারে। কারণ সক্রিয় তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ।

ভূমিকম্প প্রাকৃতিক হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ঝুঁকির বড় অংশই মানুষের তৈরি।

বহু বছর ধরে প্রকৌশলী ও নগর-পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুর্নীতি, নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই ঢাকার কাঠামোগত ঝুঁকিকে বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

শুক্রবারের ভূমিকম্প সেই পদ্ধতিগত ব্যর্থতাগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকার কাছে, রাজধানী থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে। ৭ কোটির বেশি মানুষ কম্পনটি অনুভব করেন। এছাড়া ঢাকায় এক কোটি মানুষের বেশি তীব্র কম্পন অনুভব করেন। তাদের অনেকেই আতঙ্কে অ্যাপার্টমেন্ট, হাসপাতাল এবং উচ্চ ভবনের অফিস-বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

ভয়াবহ সেই মুহূর্তের বর্ণনা করে রাজধানীর নিকেতন এলাকার বাসিন্দা শাইবুর রহমান বলেন, ‘আমি তখন একটি সেলুনে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল মেঝেটা ঢেউয়ের মতো কাঁপছে। ভবন ভেঙে পড়তে পারে— আমরা সবাই দৌড়ে বাইরে বের হয়ে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এই শহর ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত নয়। এখনও দাঁড়িয়ে আছি, সেটা যেন অলৌকিক।’

রাজউকের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি) সবগুলোই কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে। এর মধ্যে রয়েছে— মাটির পরীক্ষা, বিল্ডিংয়ের সীমানা নির্ধারণ, স্ট্রাকচারাল লোড হিসাব এবং স্বীকৃত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের নিয়ম।

তবে এসব বিষয় যে নিয়মিতভাবে উপেক্ষা করা হয়, তা স্বীকার করেছেন রাজউকের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বলেন, ‘এখন আর প্রকৌশলগত মানদণ্ড নয়, বরং দরকষাকষিই মুখ্য।’

তিনি বলেন, ‘এখন আর অনুমোদন বা নিয়ম মানার ওপর কোনও কিছু নির্ভর করে না। এটা নিলাম হয়ে গেছে। দুর্নীতিই ঠিক করে ফাইল কত দ্রুত এগোবে।’

নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন অন্তত একটি বড় নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। অনেক ভবনের অনুমোদিত তলার সংখ্যা অতিক্রম করে অতিরিক্ত তলা যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া খরচ কমাতে ভিত্তি নকশায় পরিবর্তন করা হয়। ফলাফল, এসব ভবন মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও সহ্য করতে অক্ষম।

রাজউকের ভেতরকার দালালদের চক্র অর্থের বিনিময়ে ফাইলের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন নির্মাতা বলেন, ‘কাগজপত্র একদম ঠিক থাকলেও দালাল ছাড়া ফাইল এগোয় না। কমিশন না দিলে মাসের পর মাস লাগে। ঠিক লোক থাকলে এক সপ্তাহেই হয়ে যায়।’

রাজউক ও বিশ্বব্যাংকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ঢাকায় ৮ লাখ ৬৪ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে, যা ঢাকার মোট ভবনের ৪০ শতাংশ। ওই মাত্রার ভূমিকম্প দিনে হলে কমপক্ষে ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হবে। আর রাতে হলে কমপক্ষে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যাবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ভবনে নিম্নমানের রড, দুর্বল কংক্রিট ব্যবহার, মাটির রিপোর্ট উপেক্ষা এবং যাচাইবিহীন লোড ডিজাইন— এসবই ঢাকার বেশিরভাগ ভবনের মূল সমস্যার কেন্দ্র। বলা যায়, ঢাকা এখন পুরোপুরি লাল-ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি অনিয়ন্ত্রিত ভবন এই শহরের ঝুঁকিকে আরও বাড়াচ্ছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্বৈত গতিতে কাজ করে। প্রভাবশালী ডেভেলপাররা অনুমোদন পায় দ্রুত, আর সাধারণ ভবনের মালিকদের মোকাবিলা করতে হয় বিলম্ব, জটিলতা ও ঘুষের দাবির সঙ্গে।’

বহু কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, নিয়ম না মানার কারণে অনেক চিহ্নিত ভবন পরে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ অনুমোদন পায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘প্রতিটি বিপর্যয় আমাদের সংস্কারের সুযোগ দেয়, কিন্তু রাজউক কখনও এসব থেকে শিক্ষা নেয় না। তারা তদন্ত করে, রিপোর্ট দেয়, তারপর ভুলে যায়। আর এই সময়েই হাজার হাজার অনিরাপদ ভবন বেড়ে ওঠে।’

বিশেষজ্ঞরা ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্রে পুরান ঢাকা, আফতাবনগর, বাড্ডা, রামপুরা ও বসুন্ধরাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ (লাল অঞ্চল) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও উত্তরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (কমলা অঞ্চল), আর টঙ্গী, সাভার ও পূর্বাচলের কিছু অংশ মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ অঞ্চল) হিসেবে বিবেচিত। বড় ভূমিকম্পের সময় এসব এলাকার ঢিলা মাটি তরলের মতো আচরণ করতে পারে— ফলে ভবন হেলে পড়া, ডুবে যাওয়া বা সম্পূর্ণ ধসের ঝুঁকি রয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেছেন ঢাকার ১ কোটির বেশি মানুষ। এছাড়া ৭ কোটির বেশি মানুষ মৃদু ভূকম্পন অনুভব করেছেন। আর হালকা ঝাঁকুনি পেয়েছেন আরও প্রায় পৌনে ৭ কোটি মানুষ। এ ভূমিকম্পকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী কমলা শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউএসজিএস। এর মানে হলো, এমন ভূমিকম্পে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিপর্যয় এখনও রোধ করা সম্ভব। তবে তা সম্ভব কেবল তখনই, যদি রাজউক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সংস্কার অবিলম্বে শুরু হয়। তারা আহ্বান জানিয়েছেন, অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, দালালচক্র দমন, বিএনবিসি কঠোরভাবে প্রয়োগ, স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রেট্রোফিটিং (ভবন বা কাঠামোকে নতুন বা উন্নত প্রযুক্তি, নকশা বা সামগ্রী ব্যবহার করে শক্তিশালী করা) এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া রাজনীতিমুক্ত করা।

অধ্যাপক আনসারির মতে, ‘মানুষকে ভূমিকম্প মারে না। মারে দুর্নীতি, অবহেলা আর দুর্বল ভবন।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin