রানওয়েতে পশু-পাখি, শাহজালালে বাড়ছে উড্ডয়ন-অবতরণে ঝুঁকি

রানওয়েতে পশু-পাখি, শাহজালালে বাড়ছে উড্ডয়ন-অবতরণে ঝুঁকি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে যেন পশু-পাখির অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই এসব প্রাণী বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে ঝুঁকি তৈরি করছে। সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরে শ্রীলঙ্কা থেকে আসা একটি ফ্লাইটের চাকার নিচে পড়ে শিয়াল। এতে করে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে ফ্লাইটটি। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই ফ্লাইটটি বে’তে গিয়ে দাঁড়ায়।

এর আগেও শাহজালালের বে’তে কয়েকবার বার্ড হিটিংয়ের শিকার হয় বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। হিটিংয়ের কারণে আগুন ধরার ঘটনাও ঘটে। আসন্ন শীত মৌসুমে পাখির উৎপাত আরও বাড়বে। ফলে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) এয়ার কমোডোর নূরে আলম সিদ্দিকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পশু-পাখিমুক্ত করার বর্তমানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তার চেয়েও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে যে ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে তারই আদলে এটি করা হবে। শুরুতে শাহজালাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও তা স্থাপন করা হবে।’

তবে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনো বিমানবন্দরের রাওনয়ে অবশ্যই শতভাগ শঙ্কামুক্ত থাকতে হবে। আমাদের রানওয়ে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রানওয়েতে পশুপাখির অবাধ বিচরণে অবশ্যই ফ্লাইট উড্ডয়ন কিংবা অবতরণে ঝুঁকি। এতে করে যাত্রীদের প্রাণহানির শঙ্কাও থাকে।’

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাভিয়েশন সেক্টরের বড় আতঙ্ক পাখির আঘাত বা ‘বার্ড হিট’। উড়োজাহাজ যখন আকাশে ওড়ে, তখন বিপরীত দিক থেকে পাখি আঘাত করে। এমনকি পাখি এয়ারক্রাফটের ডানায় থাকা ইঞ্জিনের ভেতরেও কখনও কখনও ঢুকে পড়ে। এতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। আবার ইঞ্জিনে আগুনও ধরে যেতে পারে। পাখি হিট করার কারণে এয়ারক্রাফট মেরামতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ, কখনও দীর্ঘ সময় লেগে যায়।’

কারণ, ইঞ্জিনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী কোম্পানিকে জানাতে হয়। ওই কোম্পানির বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা এসে সবকিছু চেক করে যে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে মেরামত করতে হয়। এতে একদিকে এয়ারক্রাফট অচল হয়ে শিডিউল বিপর্যয় হয়, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়। এ ঘটনা শুধু বিমানে বা দেশীয় এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রেই হচ্ছে তা-না, বিদেশি উড়োজাহাজেও ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাখি ও শিয়াল মারার মানসম্মত অস্ত্র নেই। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোয়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৩০টির বেশি বার্ড হিটের ঘটনা ঘটেছে। দিন দিন এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে। বন্যপ্রাণী ও বার্ড হিট ঠেকাতে শাহজালালে পাঁচটি গ্যাস ক্যানন (উচ্চশব্দের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী তাড়ানো) যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই এখন আর কাজ করছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বার্ড হিটিংয়ের কারণে টার্কিশ এয়ারলাইন্সে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাটি সবচেয়ে আলোচিত। চলতি বছরের ২১ মে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই বার্ড হিটিংয়ের কারণে আগুন ধরে যায়। ২৯১ জন যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটি দ্রুতই আবারো শাহজালালে অবতরণ করে। পরবর্তীতে যাত্রীদের নিরাপদে ফ্লাইট থেকে বের করে আনা হয়। ২৮ জুন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিঙ্গাপুরগামী ফ্লাইট (বোয়িং-৭৩৭-৮০০) ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পরই এর একটি ইঞ্জিন পাখির আঘাতের শিকার হয়। পাইলট বিষয়টি আঁচ করতে পেরে দ্রুত সিঙ্গাপুর যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে জরুরি অবতরণ করান। ফলে অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় এই ফ্লাইটের পাইলট, কেবিন ক্রু ও যাত্রীরা। এরপর গত ১১ অক্টোবর শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ফিস্ট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের চাকার ভেতরে শিয়াল ঢুকে যায়। ২০০ এর বেশি যাত্রী নিয়ে অবতরণকারী ফ্লাইটটি বিপতের সম্মুখীন থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ধারাবাহিক এ সকল ঘটনায় বিমানবন্দরের রাওনয়ে আরও নিরাপদ করার সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin