দীপাবলির আগে দিল্লির প্রাণকেন্দ্র লাজপাত নগরের গয়নার বাজারে এখন উপচেপড়া ভিড়। উৎসবের আমেজে দোকানগুলো খোলা রাখছে ছুটির দিনেও, সন্ধ্যার পর রাস্তায় সারি সারি গাড়ি, ঝলমলে সাইনবোর্ডে ভিড় জমাচ্ছে ক্রেতারা।
বিশ্বে স্বর্ণের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত। ১০ গ্রাম স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৪৪০ ডলার ছুঁয়ে গেলেও, ভারতীয়দের স্বর্ণের প্রতি অনুরাগ তেমন কমেনি। বরং দীপাবলি ও ধনতেরাসের শুভক্ষণে লাখ লাখ মানুষ এখনও স্বর্ণের মুদ্রা, বার ও গয়না কিনতে বাজারে ছুটছেন। তাদের বিশ্বাস, এতে সৌভাগ্য আসে।
দিল্লির কুমার জুয়েলার্সের মালিক প্রকাশ পালহাজানি বলেন, দাম অনেক বেড়েছে, তবু ক্রেতা কমেনি। সবাই ভাবছে, আরও দাম বাড়লে পরে কিনতে পারবে না। ফলে এবার তার দোকানে ক্রেতা বেড়েছে আগের চেয়ে।
তবে বাজেট সামলাতে বিক্রেতাদেরও কৌশল বদলাতে হচ্ছে। পাশের দোকানের মালিক তনিষ্ক গুপ্ত বলেন, মানুষ বলছে, কিনব না, তা নয়। একটু কম কিনব। তাই আমরা এমন ডিজাইন করছি, যেগুলো দেখতে ভারী হলেও আসলে হালকা।
তিনি জানান, এখন ২৫০ মিলিগ্রাম স্বর্ণের পাতলা কয়েনও বিক্রি হচ্ছে ৩৫ ডলারে। এমনকি ২৫ মিলিগ্রামের ক্ষুদ্র কয়েনও বাজারে এসেছে।
আরেক বিক্রেতা পুষ্পিন্দর চৌহান জানান, দামের কারণে তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে হালকা, দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য গয়নার চাহিদা বেড়েছে। উৎসব বা বিয়ের জন্য ভারী গয়নার ঝোঁক কমছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে আরও এক প্রবণতা স্পষ্টহচ্ছে। গয়না নয়, বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ ও রুপা কেনা বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারতের স্বর্ণের মোট চাহিদার ৬৪ শতাংশ এসেছে গয়না থেকে, যেখানে গত বছর একই সময়ে তা ছিল ৮০ শতাংশ। অপরদিকে, বিনিয়োগনির্ভর চাহিদা বেড়ে ১৯ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
ডব্লিউজিসির গবেষণা প্রধান কবিতা চাক্কো জানান, ইটিএফ বা ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই খাতে সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f33f705f753" ) );
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বর্ণের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৪ শতাংশ। যা তিন বছর ধরে বৈশ্বিক চাহিদার অন্যতম চালিকা শক্তি।
কোটাক সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক কায়নাত চেইনওয়ালা বলেন, রিজার্ভ ব্যাংক ডলারনির্ভরতা কমাতে এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্থিতিশীলতা আনতে স্বর্ণ মজুত বাড়াচ্ছে।
ব্যাংক অব বরোদার প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সভনাভিস বলেন, ধনিক শ্রেণি আগের মতোই কিনবে, যদিও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি বড় ধাক্কা। পরিমাণ কমলেও মূল্যের হিসাবে চাহিদা টিকে থাকবে।
তবে সবার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে হতে যাওয়া ভাবনা বলেন, এখন ভাবছি, আদৌ কিনব কি না। দাম একটু কমলে তারপরই হয়তো কেনাকাটা করব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়দের স্বর্ণের সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে এই চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে কমবে না। এমনকি অর্থনৈতিক মন্দা ও কর্মসংস্থানের সংকটেও অনেক পরিবার স্বর্ণের মতো সম্পদ বিক্রি না করে সমৃদ্ধ হয়েছে।
মরগান স্ট্যানলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় পরিবারগুলোর হাতে থাকা স্বর্ণের মোট মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ উপাসনা চাচরা ও বাণী গম্ভীর লিখেছেন, স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি পরিবারগুলোর সম্পদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি সুদ কমা ও করছাড়ের কারণে ব্যবহারযোগ্য আয়ও বেড়েছে।
তাই রেকর্ড দামে কিছুটা উজ্জ্বলতা কমলেও, দীপাবলির এই স্বর্ণের জোয়ারে ভারতের ঐতিহ্যিক উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি।
সূত্র: বিবিসি