রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘যোসেফাইট ম্যাথ ম্যানিয়া ২০২৫’ তরুণ শিক্ষার্থীদের মধে৵ অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। ‘ফার্ম ফ্রেশ’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথম আলোর সহযোগিতায় আয়োজিত এই গণিত উৎসবে শিক্ষার্থীরা মেধা, যুক্তি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক কঠিন লড়াইয়ে অংশ নেয়। এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা ছিল না; বরং গণিতকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক আনন্দময় যাত্রা ছিল এটি।
প্রথম দিন: উৎসবের সূচনা ও নতুন অধ্যায়ের উন্মোচন
১১ সেপ্টেম্বর এই গণিত উৎসবের শুভসূচনা হয়। সকাল থেকেই স্কুল প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণবন্ত। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত কাউন্টারে রিপোর্ট ও রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যস্ত ছিল। তাদের চোখেমুখে ছিল উত্তেজনা আর নতুন কিছু শেখার আগ্রহ। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই মহাযজ্ঞের সূচনা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (আইআরই) অধ্যাপক আবদুল হালিম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক স্বাক্ষর শতাব্দ।
এরপর শুরু হয় দিনের প্রথম ইভেন্ট ‘জেনেসিস’, যেখানে শিক্ষার্থীদের গাণিতিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করা হয়। মধ্যাহ্নভোজের পর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মজার ইভেন্ট ছিল ‘ক্রিপ্টোম্যানিয়া’। এতে শিক্ষার্থীরা কোড ও সংকেত ব্যবহার করে গণিতবিষয়ক ধাঁধা সমাধান করে এবং প্রতিটি ধাঁধার সমাধান তাদের পরবর্তী ক্লু পর্যন্ত নিয়ে যায়। দিনের শেষ ইভেন্ট ছিল ‘টিক-ট্যাক-টো’, তবে গণিতের সমীকরণ ব্যবহার করে খেলাটিকে এক ভিন্নমাত্রা দেওয়া হয়। প্রথম দিনের প্রতিটি ইভেন্টই প্রমাণ করেছে যে গণিত শুধু ক্লাসের চারদেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক বিশাল উন্মুক্ত জগৎ।
দ্বিতীয় দিন: মেধার কঠিন লড়াই ও গণিতের গভীর অনুসন্ধান
১২ সেপ্টেম্বর ছিল মেধার আসল পরীক্ষা। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় ‘সুডোকু’, যা শিক্ষার্থীদের যুক্তি ও প্যাটার্ন বোঝার ক্ষমতাকে তীক্ষ্ণ করে তোলে। এরপর ছিল উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট, ‘গণিত অলিম্পিয়াড’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গণিতপ্রেমীরা অর্জিত জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের কৌশল ব্যবহার করে জটিল প্রশ্নগুলোর সমাধান করে।
দুপুরের পর ছিল ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ এবং ‘প্রোবাবিলিটি প্রেশার’। ‘হিউম্যান ক্যালকুলেটর’-এ শিক্ষার্থীরা কোনো যন্ত্র ছাড়াই দ্রুত বড় বড় সংখ্যার হিসাব করে, যা দেখে বিচারক ও দর্শকেরা মুগ্ধ হন। অন্যদিকে ‘প্রোবাবিলিটি প্রেশার’-এ সম্ভাবনা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে নানা চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দিনের প্রতিটি ইভেন্টই ছিল গণিতের প্রতি ভালোবাসা ও মেধার দারুণ প্রদর্শনী।
তৃতীয় দিন: চূড়ান্ত মুহূর্ত ও বিজয়ের উল্লাস
১৩ সেপ্টেম্বর ছিল উৎসবের শেষ ও সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ দিন। সকালে শুরু হয় ‘জিওমেট্রিক ড্যাশ’ ও ‘আইকিউ টেস্ট’, যা দ্বারা শিক্ষার্থীদের সাধারণ বুদ্ধি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে পরীক্ষা করা হয়। দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট ছিল ‘ট্রেজার হান্ট’। স্কুলের বিশাল প্রাঙ্গণে লুকানো গাণিতিক ধাঁধা ও ক্লু খুঁজে বের করার এই খেলায় শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে অংশ নেয়। এটি কেবল গণিতের খেলা ছিল না; বরং দলগত কাজ, কৌশল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক চমৎকার প্রদর্শনী ছিল এটি।
এরপর ছিল ‘রুবিকস কিউব’, যেখানে গণিত, স্থানিক বুদ্ধি ও দ্রুত হাতে কাজ করার অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়।
বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে এই সফল আয়োজনের। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিডিএমওর সভাপতি ও বুয়েটের সিএসই বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বুয়েটের সিএসই বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. শামসুজ্জোহা বাইজিদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের (এএফইএইচআরডি) মহাপরিচালক ও ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক অধ্যাপক ফারজানা আলম শম্পা এবং বিডিএমওর কাউন্সিলর সকাল রায়।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, মেডেল ও সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, এই উৎসব তাদের মধ্যে গণিত নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে এবং গণিতভীতি দূর করেছে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘গণিত আমাদের কেবল সমস্যার সমাধান শেখায় না; বরং সঠিকভাবে ভাবতে ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তি প্রয়োগ করতে শেখায়।’
এই তিন দিনের আয়োজন প্রমাণ করেছে, গণিত শুধু একটি বিষয় নয়, এটি এক আনন্দময় জগৎ, যা তরুণদের মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছে।