সিলেট থেকে রণাঙ্গন: ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের বিশ্বযুদ্ধের গল্প প্রকাশের আহ্বান

সিলেট থেকে রণাঙ্গন: ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের বিশ্বযুদ্ধের গল্প প্রকাশের আহ্বান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে লড়ে যাওয়া ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবারগুলোকে তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাথা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। রয়্যাল ব্রিটিশ লিজিওন’র সমর্থনে থিঙ্কট্যাঙ্ক ব্রিটিশ ফিউচার এবং ব্রিটিশ এশিয়ান সংবাদপত্র ইস্টার্ন আই’র যৌথ উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে ‘মাই ফ্যামিলি লিগ্যাসি’ প্রকল্প। প্রকল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন আর্কাইভ তৈরির কাজ শুরু করেছে। ওই প্রকল্পের জন্য ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের বিশ্বযুদ্ধের গল্প চাওয়া হয়।

ওই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো, প্রবীণ সৈনিকদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করে ব্রিটেনের বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ইতিহাস ও আত্মত্যাগের বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

ব্রিটিশ ফিউচারের জন্য পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ জনগণের অর্ধেকই জানে না দক্ষিণ এশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বযুদ্ধে কত বড় অবদান রেখেছিলেন। এমনকি ব্রিটিশ এশীয়দের মধ্যেও প্রায় ৪০ শতাংশ এই উত্তরাধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।

ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের ঐতিহাসিক পটভূমি

ব্রিটিশ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটি তাদের বর্তমানকে পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক ত্যাগের প্রেক্ষাপটে স্থাপনের এক সুযোগ এনে দিয়েছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের অধিকাংশই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত সিলেট অঞ্চল থেকে এসেছেন। এই অঞ্চল থেকেই অসংখ্য পুরুষ ব্রিটিশ যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যোগ দেন।

ঐতিহাসিকভাবে সিলেটের মানুষজন দীর্ঘকাল ধরে জাহাজে কাজ করার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এ কারণে অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্চেন্ট নেভিতে যোগ দেন এবং আটলান্টিক কনভয়ে জার্মান ইউ-বোটের হামলার মুখে পড়েন। অন্য অনেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে একাধিক রণাঙ্গনে লড়াই করেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই প্রবীণ সৈনিক এবং নাবিকদের অনেকেই ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনকারী প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে আবির্ভূত হন। তারা বন্দর শহর লন্ডনে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে তাদের আদি সম্প্রদায় আজকের প্রাণবন্ত ব্রিটিশ বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ভিত্তি তৈরি করেছিল। সাম্রাজ্যের জন্য লড়াই থেকে শুরু করে যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনকে পুনর্গঠন– তাদের এই অবদানের ইতিহাস ব্রিটিশ জাতীয় কাহিনীর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

শহীদ ও তাদের উত্তরসূরিদের সম্মান

প্রকল্পটি পরিবারগুলোকে তাদের পূর্বপুরুষ বা জীবিত আত্মীয়দের ছবি, নাম এবং তাদের সামরিক পরিষেবা সম্পর্কিত বিস্তারিত গল্প জানাতে অনুরোধ জানিয়েছে।

হাউস অব কমন্স ডিফেন্স কমিটির চেয়ারম্যান এমপি তানমানজিৎ সিং ধেসি আয়োজিত  ৪ নভেম্বরের এক সংসদীয় স্মরণসভায় এই প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সভায় সম্প্রতি প্রয়াত হওয়া দুই প্রবীণ সৈনিককে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তাদের গল্পগুলি এই আর্কাইভের প্রথম সংযোজন। তাদের একজন হাবিলদার মেজর রাজিন্দর সিং ধাত এমবিই। তিনি জাপানিদের ভারত আক্রমণের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কোহিমা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অপরজন সার্জেন্ট মুহাম্মদ হোসেন। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ইতালিতে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে মন্টে ক্যাসিনোর তীব্র যুদ্ধে লড়েছিলেন।

সার্জেন্ট হোসেনের নাতি এজাজ হোসেন গল্পের রেকর্ড করার প্রয়োজনীয়তাকে অপরিহার্য বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই সম্মিলিত ইতিহাস, যেখানে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন লক্ষ্যের জন্য মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি দেশ হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে।

মেজর সিং ধাতের নাতনি অমৃত কৌর ধাত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কমনওয়েলথ এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সৈন্যদের মূলধারার ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই এখন তাদের গল্পগুলিকে ধরে রাখা এত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিটিশ ফিউচারের পরিচালক সুন্দার কাটওয়ালা বলেন, মাই ফ্যামিলি লিগ্যাসির লক্ষ্য হলো মানুষের সাহস, অবদান, সেবা ও ত্যাগের পারিবারিক গল্পগুলি আবিষ্কার, নথিভুক্ত এবং ভাগ করে নিতে সাহায্য করা। এটি দেখাবে কীভাবে স্মরণ করার ঐতিহ্য আজকের আধুনিক, বৈচিত্র্যময় ব্রিটেনকে এক করতে পারে।

রয়্যাল ব্রিটিশ লিজিওন’র ডিরেক্টর গেইল ওয়াল্টারস বলেন, তার দাতব্য সংস্থা চায় যেন আরও বেশি পরিবার স্মরণ অনুষ্ঠানে নিজেদের অংশ মনে করে। ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয় সামরিক কর্মীদের সম্মান জানানোর মাধ্যমে ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবং জাতীয় গল্পে তাদের অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা তুলে ধরা হবে।

লেখক গবেষক ড রেনু লুৎফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্রিটিশ বাংলাদেশি অনেক পরিবারের কাছে তাদের পূর্বপুরুষদের এই দেশের ইতিহাসে স্থায়ী ও সম্পূর্ণ স্বীকৃতি নিশ্চিত করার উপযুক্ত সময় এটি নয়। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছিলেন যে বাংলাদেশিরা, মাত্র কয়েকজনই এখন জীবিত আছেন। তাদের অনেকেই এখন স্মৃতিচারণের অবস্থায় নেই। এমন উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।

Comments

0 total

Be the first to comment.

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা BanglaTribune | আন্তর্জাতিক

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা

নেপালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউদেল এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কা...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin