অনেকে সংগ্রামের জীবন থেকে বিচ্যুত হলেও বদরুদ্দীন উমর কখনও সংগ্রামের জীবন থেকে বিচ্যুত হননি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘তাকে (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) কখনও হতাশ হতে দেখিনি।’
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে প্রয়াত বাম রাজনীতিবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের জীবনাবসানে তাকে স্মরণ করে আয়োজিত শোকসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শোকসভাটি বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে শুরু হয়। এতে বক্তব্য দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ একাধিক ব্যক্তিবর্গ।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। আমাদের সমাজের অবসাদ কত প্রবল হয়ে আসে, ভীতি কীভাবে কাজ করে ভীতির উলটো দিকে মোহ কীভাবে কাজ করে বদরুদ্দীন উমরের ক্ষেত্রে কোনোটাই ঘটেনি। তিনি সারাজীবন কাজের মধ্যে ছিলেন। ক্লান্তি কাকে বলে তিনি জানতেন না। ভয়ের কথা যদি বলি সেটা তো আমাদের সমাজের সর্বত্র বিস্তৃত। কিন্তু বদরুদ্দীন উমর কখনও ভীত হননি।’
তিনি বলেন, ‘যে হলিডে পত্রিকাতে তিনি লিখতেন সেই পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়, তাতেও তিনি ভীত হননি। কোনও মোহ তাকে ছুঁতে পারেনি। আবার সংগ্রামের জীবন থেকে অনেকে বিচ্যুত হলেও বদরুদ্দীন উমর বিচ্যুত হননি। তাকে কখনও হতাশ হতে দেখিনি।’
সংস্কৃতি পত্রিকার সম্পাদক ও বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর যখন রাজনৈতিক সংগ্রামটা বাংলাদেশে করতে যাচ্ছেন, তখন তিনি তার পত্রিকার নাম দিয়েছেন “সংস্কৃতি”। কারণ তিনি সংগ্রামটা মনোভূমি এবং জমিন দুই জায়গায়ই করতে চেয়েছেন। সংস্কৃতি পত্রিকায় তিনি বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও সমালোচনা করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তিনি সাংগঠনিক কাজে গিয়েছেন। জমিন এবং মনোভূমি এই দুই ময়দানের যোদ্ধা এবং নেতা বদরুদ্দীন উমর। অনেকদিন আমরা একসঙ্গে চলেছি। তিনি চলে গিয়ে নতুন একজন বদরুদ্দীন উমরকে আমাদের মধ্যে পরিচিত করে দিয়ে গিয়েছেন।’
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উপদেষ্টা খালিকুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘কমরেড বদরুদ্দীন উমর আজীবন বিপ্লবের পথে হেঁটেছেন। তিনি সুবিধাবাদের পথে হাঁটেননি। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কথা হতে পারে তবে তিনি কখনোই সুবিধাবাদের পথে হাঁটেননি।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা কিছুটা বিপ্লববিরোধী ছিলাম। আমি ছাত্রলীগ করতাম। আমরা স্লোগান দিতাম “হো হো মাও মাও, চিনে যাও ব্যাঙ খাও”। ও সময় ভালো ছেলে রাজনীতি করবে এটা একদমই প্রচলিত ছিল না। আমাদের সে সময়ের রাজনীতি ছিল জ্ঞান বিবর্জিত। রাজনীতিতে জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আসেন বদরুদ্দীন উমর।’
অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘যদি বর্তমান সময়ের মানুষকে ইতিহাসকে বুঝতে হয় তাহলে বদরুদ্দীন উমরের কাছে যেতে হবে। এ সময়ে বিপ্লবী তত্ত্বকে অনুধাবন ও পর্যালোচনা করে গুণধার বিপ্লবী চিন্তা বুঝতে হলে বদরুদ্দীন উমরের কাছে যেতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি করতে করতে বদরুদ্দীন উমর বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বাম আন্দোলনের দুর্বলতা সম্পর্কে আমরা জানি। এই দুর্বলতার কারণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বদরুদ্দীন উমরের লেখায় আছে। সেই লেখার পর্যালোচনারো দরকার আছে। সময় রাজনীতি অর্থনীতি বিশ্ব পরিস্থিতি বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতিসহ সমস্ত কিছু বোজার জন্য বদরুদ্দীন উমর একজন অনিবার্য সঙ্গী।’
দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরিতেও বদরুদ্দীন উমরের ভূমিকা আছে। বদরুদ্দীন উমরের লেখনির মাধ্যমে শুধু মার্ক্সবাদীরা নয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী রাজনীতি সচেতন ও উপকৃত হচ্ছেন। বদরুদ্দীন উমর তার কাজের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। বীরত্বের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।’
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর এমন একজন মানুষ ছিলেন, আমাদের মত তরুণরা তার সান্নিধ্য খুব একটা না পেলেও তার যে বিপ্লবের চেতনা তা তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেছে।’
শোক সভায় বদরুদ্দীন উমরের পরিবারের পক্ষ থেকে তার মেয়ের হয়ে কথা বলেন সারা আক্তার বানু নামের একজন। বদরুদ্দীন উমরের মেয়ের লেখা পাঠ করে তিনি বলেন, ‘বাবার শেষের বছরগুলোতে শ্রবণ শক্তির অসুবিধা ছিল, তা সত্ত্বেও তিনি বক্তব্য দিয়েছেন ও দেশের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন। আমরা ছোটবেলা থেকেই তার কঠিন রাজনৈতিক জীবন ধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। তিনি শোষণহীন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন।’
গগণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমরের অনেক যোগ্য এবং অযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে আমিও একজন। কার্ল মার্ক্স-এর অনুসারী হিসেবে বদরুদ্দীন উমর সব সময় সবকিছুর রুথলেস ক্রিটিসিজম করেছেন। কিন্তু বদরুদ্দীন কাছ থেকে আমরা যেটা শিখেছি, এই যে প্রগতিশীলতা মানে ধর্মীয় রাজনীতির যে বিভিন্ন ফর্ম আছে- সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কিংবা মৌলবাদী রাজনীতি- এইগুলো শ্রেণী সংগ্রামের ঊর্ধ্বে না। এটা শ্রেণী সংগ্রামের অধীন এবং বদরুদ্দীনই সম্ভবত কনসিস্টেন্টলি বাংলাদেশের বামপন্থী তত্ত্বের মধ্যে অন্যতম এবং প্রধান, যিনি এই জায়গাটা লড়াই করেছেন। মৌলবাদের উনি তীব্র সমালোচক ছিলেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূলোৎপাটন করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। কিন্তু তার এইটাকে কখনও তিনি শ্রেণী সংগ্রামের ওপরে স্থান দেননি।’
শোকসভায় বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে নিজের বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক। তিনি তার লেখালেখির প্রশংসা করেন এবং তার জীবনাবসানে শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমর দুবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরকম সাহসী মানুষ এই ভূমি দুবার জন্ম দেয়নি।’
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফউজুল হাকিম লালার সঞ্চালনায় শোকসভায় বাংলাদেশ কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশনসহ একাধিক সংগঠনের নেতৃত্বরা তাকে স্মরণ করে বক্তব্য দেন এবং শোক প্রকাশ করেন।