প্রশ্ন: আমার স্ত্রী গত তিন বছর ধরে অসুস্থ। তার কিডনি সমস্যার কারণে অনেক সাবধানে ও যত্নে রাখতে হয়। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি। সমস্যা হচ্ছে তিনি আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেন। সারাক্ষণ ভুল ধরতে থাকেন। একটু সন্দেহও করেন বলে আমার মনে হয়। অথচ তার অসুস্থতার কারণে আমি অফিস বাসা ছাড়া অন্য কোথাও বাড়তি সময় ব্যয় করি না। তাকে আরামদায়ক জায়গায় মাঝে মধ্যে ঘুরতে নিয়ে যাই কিন্তু অশান্তি দিন দিন বাড়ছে। কী করবো?
উত্তর: শুরুতেই আমাদের বুঝতে হবে আপনার স্ত্রীর এমন আচরণের সম্ভাব্য কারণসমূহ কী। এটা অসুস্থতাজনিত মানসিক চাপ ও হতাশা থেকে হতে পারে। দীর্ঘ তিন বছর ধরে অসুস্থ থাকা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে না পারা এবং ক্রমাগত চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ফলে তার মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা, বিরক্তি ও বিষণ্ণতা কাজ করতে পারে। এই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই হয়তো তার আচরণে রুক্ষতা বা খিটখিটে ভাব চলে আসা স্বাভাবিক।
তার শারীরিক যন্ত্রণা আমাদের বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। কিডনি রোগীদের প্রায়শই নানা রকম শারীরিক কষ্ট ও অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এই কষ্টগুলোও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার একটা বড় কারণ। এর সঙ্গে আছে ভবিষ্যতের ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা। গুরুতর অসুস্থতা মানুষকে ভবিষ্যতের ব্যাপারে ভীত করে তোলে। নিজের জীবন, আপনাদের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তিনি হয়তো অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা সন্দেহপ্রবণ আচরণ করছেন। তিনি হয়তো ভয় পাচ্ছেন যে এই অসুস্থতার কারণে আপনি তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন বা তার প্রতি আপনার ভালোবাসা কমে যেতে পারে। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেও তিনি আপনার ছোটখাটো বিষয়ে ভুল ধরতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে আপনার করণীয়
১. সহানুভূতির সাথে তার আচরণকে দেখুন: তার দুর্ব্যবহারকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে, তার অসুস্থতার প্রকাশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করুন। ভাবুন, তার ভেতরের কষ্টগুলোই হয়তো রাগের মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে।
২. খোলামেলা এবং শান্তভাবে কথা বলুন: ঝগড়া বা অশান্তি না বাড়িয়ে, কোনও এক শান্ত মুহূর্তে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন। তাকে বলুন যে আপনি তার কষ্টটা বোঝেন, কিন্তু তার আচরণে আপনিও কষ্ট পাচ্ছেন।
৩. নিজের যত্ন নিন (এটা অত্যন্ত জরুরি): সারাক্ষণ অন্যের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যাবেন না। আপনি যদি সুস্থ ও মানসিকভাবে শান্ত না থাকেন, তাহলে স্ত্রীর যত্ন নেবেন কীভাবে? প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করুন। সেটা হতে পারে বই পড়া, গান শোনা, বন্ধুর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলা বা ছাদে একা হাঁটা। মাঝে মাঝে নির্ভরযোগ্য কাউকে স্ত্রীর কাছে রেখে অল্প সময়ের জন্য বাইরে থেকে ঘুরে আসুন।
৪. ছোট ছোট বিষয়ে প্রশংসা করুন: তার ছোট ছোট ইতিবাচক কাজের বা কথার প্রশংসা করুন। এতে তিনি কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করতে পারেন।
৫. বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন: স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসাথে অথবা আপনি একা একজন কাউন্সিলর বা থেরাপিস্টের সাথে কথা বলতে পারেন। একজন পেশাদার কাউন্সিলর আপনাদের সমস্যাগুলো বুঝতে এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে সাহায্য করতে পারেন। আপনার স্ত্রীর ডাক্তারের সাথে তার মানসিক অবস্থা নিয়ে কথা বলুন। অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার সাথে মানসিক অবসাদ বা অ্যাংজাইটির চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, যা মূল চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত।
৬. সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করুন: তিনি যদি সন্দেহ করেন, তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করুন। আপনার সারাদিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে তাকে জানান। স্বচ্ছতা বজায় রাখলে হয়তো তার নিরাপত্তাহীনতা কিছুটা কমতে পারে।
মনে রাখবেন, এই পরিস্থিতি এক দিনে বদলাবে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং ভালোবাসা। আপনি ইতিমধ্যেই গত তিন বছর ধরে অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, যা প্রশংসার যোগ্য। আপনার এবং আপনার স্ত্রীর জন্য শুভকামনা।
প্রশ্ন: আমার মেয়ের বয়স ১৩। আমরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। ছোট থেকে সময় দিতে পারিনি বলে এখন সে আমাদের কোনও পরামর্শই নিতে চায় না। এবং সবসময় আমাদের মধ্যে অপরাধবোধ জন্ম দিতে নানা ইমোশনাল পরিস্থিতি তৈরি করে। আমরা অফিসের ৮ ঘণ্টা বাদে পুরো সময়টাই তার জন্য রেখেছি সবসময়। অন্য বন্ধুদের মায়ের মতো সারাদিন কাছে না থাকার কারণে সে এরকম করে বলে আমার মনে হয়। চাকরি ছেড়ে দেওয়া কোনও সমাধান না। এ পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি।
উত্তর: প্রথমেই বুঝতে হবে, আপনার মেয়ের বয়স ১৩ বছর, অর্থাৎ সে বয়ঃসন্ধিকালের (adolescence) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে তাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক অনেক পরিবর্তন আসে। এটা এমন একটা পর্যায় যখন শিশুরা নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে, বন্ধুদের গুরুত্ব দেয় এবং বাবা-মায়ের থেকে কিছুটা মানসিক দূরত্ব তৈরি করে। তাই তার আচরণকে পুরোপুরি আপনাদের সময় না দেওয়ার ফল হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে তার বয়স এবং পারিপার্শ্বিকতারও বড় ভূমিকা রয়েছে।
আপনারা যে অপরাধবোধে ভুগছেন, সেটাও অস্বাভাবিক নয়। তবে আপনার মেয়ে যে ‘ইমোশনাল পরিস্থিতি’ তৈরি করে আপনাদের মধ্যে অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে, সেটা তার নিজের ভেতরের কষ্ট, একাকীত্ব বা অভিমানেরই একটি প্রকাশ হতে পারে। সে হয়তো বোঝাতে চাইছে যে, সে আপনাদের মনোযোগ চায়।
চাকরি ছেড়ে দেওয়া কোনও সমাধান নয় এবং এর কোনও প্রয়োজনও নেই। বরং কিছু কৌশল অবলম্বন করে আপনারা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন এবং মেয়ের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেন।
১. কোয়ালিটি টাইম, কোয়ান্টিটি নয়: আপনারা কতক্ষণ সময় দিচ্ছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেটুকু সময় দিচ্ছেন তার মান কেমন। অফিসের পর বাসায় ফিরে আপনারা হয়তো ক্লান্ত থাকেন, কিন্তু সেই সময়ের কিছুটা অংশ একান্তে শুধু মেয়ের জন্য রাখুন। প্রতিদিন অন্তত রাতের খাবারের সময়টা একসাথে কাটান এবং নিয়ম করুন এসময় কোনও মোবাইল ফোন বা টিভি চলবে না। সারাদিন কার কেমন কাটলো, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন।
২. একান্তে সময়: সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাবা অথবা মা আলাদাভাবে মেয়ের সাথে সময় কাটান। হতে পারে সেটা একসাথে আইসক্রিম খেতে যাওয়া, তার পছন্দের কোনও সিনেমা দেখা বা নিছকই তার ঘরে বসে গল্প করা। এতে সে আলাদাভাবে আপনাদের সাথে সংযোগ অনুভব করবে।
৩. তার পছন্দের কাজে যোগ দিন: তার আগ্রহের বিষয় কী? সে কি গান শুনতে, ছবি আঁকতে বা গেম খেলতে ভালোবাসে? তার পছন্দের কাজে আগ্রহ দেখান এবং সম্ভব হলে তার সাথে যোগ দিন। এতে সে বুঝবে যে আপনারা তার জগতটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
৪. অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসুন: বুঝতে চেষ্টা করুন যে আপনারা আপনাদের সাধ্যমতো সেরাটাই করছেন। চাকরি করাটা আপনাদের পরিবারের প্রয়োজনেই। অপরাধবোধ থেকে কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। মেয়ের কাছে নিজেদের অসহায় বা অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করবেন না। এতে সে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।
৫. খোলামেলা আলোচনা: মেয়ের সাথে সরাসরি কথা বলুন। তাকে বোঝান যে, ছোটবেলায় কেন আপনারা তাকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি। তাকে বলুন, ‘আমরা জানি, ছোটবেলায় আমরা তোমাকে হয়তো ততটা সময় দিতে পারিনি যতটা দরকার ছিল, কারণ আমাদের কাজ করতে হতো। এর জন্য আমাদেরও খুব খারাপ লাগে। কিন্তু আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসি এবং এখন তোমার সাথে সম্পর্কটা আরও ভালো করতে চাই।’
সে যখন বলে যে আপনারা সময় দেন না, তখন রক্ষণাত্মক না হয়ে বা ‘আমরা তো তোমার জন্যই করি’ জাতীয় কথা না বলে, তার অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিন। বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তোমার খুব একা লাগে/কষ্ট হয়। চলো, আমরা ভাবি কীভাবে এটা ঠিক করা যায়।’
৬. সীমানা নির্ধারণ (Setting Boundaries): তাকে ভালোবাসা এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট করতে হবে যে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল বা খারাপ ব্যবহার করে কোনও কিছু আদায় করা যাবে না। শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে তাকে বলুন, ‘তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু এভাবে কথা বলা বা আচরণ করা ঠিক নয়। আমরা শান্তভাবে এটা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।’
৭. পরামর্শদাতা হন, শাসক নয়: এই বয়সে ছেলেমেয়েরা উপদেশের চেয়ে বন্ধুত্ব বেশি পছন্দ করে। তাদের কোনও কিছু সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে, বিভিন্ন বিকল্পের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করুন। তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানুন, তাদের সাথে মিশুন, কিন্তু বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না। সম্পর্কের এই দূরত্ব এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই এক দিনে এর সমাধানও হবে না। আপনাদের ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আপনাদের আন্তরিকতা এবং ধারাবাহিক চেষ্টা তার মনোভাবকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে।
৮. পেশাদার সাহায্য: যদি দেখেন যে পরিস্থিতি কোনোভাবেই উন্নতি করছে না এবং আপনাদের পক্ষে একা সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে, তবে একজন শিশু বা পারিবারিক কাউন্সিলরের সাহায্য নিতে পারেন। একজন বিশেষজ্ঞ আপনাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন এবং আপনাদের ও আপনার মেয়ের মধ্যে একটি সুস্থ যোগাযোগের সেতু তৈরি করতে সাহায্য করবেন।
মনে রাখবেন, আপনাদের মেয়ে আপনাদের ভালোবাসে, কিন্তু তার প্রকাশের ধরণটা হয়তো এখন ভিন্ন। তার আচরণের পেছনের কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন এবং ভালোবাসার সাথে তাকে কাছে টেনে নিন। আপনাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অবশ্যই সফল হবে।