সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: ধূসর মৃত্যুর মুখ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: ধূসর মৃত্যুর মুখ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের `নন্দনতত্ত্ব' (১৯৮৬) যখন প্রকাশিত হলো, তখন সে বছরই মেলা থেকে বইটা কিনেছিলাম। লেখক হতে চাওয়া যে-কোনো তরুণেরই এই বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক। তাঁর এই বইটি পড়ে খুব যে মুগ্ধ হয়েছি তা বলব না। এই বিষয়টিকে আরও বেশি গ্রাহ্য ও বোধগম্য করার জন্য যে-পরিসর দরকার, তা এই ক্ষুদ্রায়তনে সম্ভব ছিল না। মনজুরুল ইসলাম এই বিষয়ে খুবই যোগ্য লেখক ছিলেন, কিন্তু বাংলা অ্যাকাডেমির নির্ধারিত ওই ছোট্ট পরিসরে তাঁর সমস্ত যোগ্যতাকে পরিস্ফুট করার সুযোগ ছিল না। সুতরাং এই ক্ষেত্রে তাঁর করার কিছু ছিল না। তবে ১৯৯২ সালে তাঁর প্রবন্ধের বই `কতিপয় প্রবন্ধ’ বইটি পড়ে সত্যি মুগ্ধ হয়েছিলাম। নামটা খুবই সাদামাটা, এবং ‘কতিপয়’ শব্দটা যেহেতু দুষ্কৃতিকারী শব্দটির আগে ব্যবহৃত হয়ে থাকে খুব, তাই ওই শিরোনাম দেখে নিজের মনেই এক কৌতুক অনুভব করেছিলাম। কিন্তু বইয়ের প্রবন্ধগুলো পড়ে মনে হয়েছিল, আবদুল মান্নান সৈয়দের পর সত্যিকারের এক রসজ্ঞ ও মননশীল সাহিত্য সমালোচকের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে। সেই ধারণা আরও দৃঢ় হলো যখন দেখলাম তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে ‘অলস দিনের হাওয়া’ শিরোনামে নিয়মিত এক কলাম লিখছেন বিদেশি সাহিত্য নিয়ে। সেখানে তিনি এমন সব লেখকদের নিয়ে লিখছিলেন যাদের কথা আমাদের মতো তরুণ লেখকদের অনেকের কাছেই তখন ছিল অজানা। তিনি দেশি ও বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে ছিলেন খুবই ওয়াকিবহাল। এবং এদের সম্পর্কে তাঁর কেবল জানাশোনা নয়, বলা যায়, মূল্যায়নও ছিল গভীর ও নির্ভুল। কিন্তু তিনি এই পথে তাঁর পদচারণা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে। তিনি ছড়িয়ে পড়েছিলেন শিল্প সমালোচনা, সমসাময়িক রাজনীতি, সংস্কৃতি আর সামাজিক বিষয়ের দিকে। কিন্তু সেগুলো ছিল সাময়িক প্রয়োজনে সাড়া দেয়ার তাগিদ থেকে, ফলে সেখানে সমকালের ভাষ্য রচিত হয়েছে ঠিকই, এগুলোর মধ্যে অনেক অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষণও আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে আমাদের যে দীনতা, সেটা পূরণের ক্ষেত্রে কাম্য উপস্থিতি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে কারো কারোর বই নিয়ে হয়ত লিখেছেন, কিন্তু সেই লেখাগুলো তাঁর `কতিপয় প্রবন্ধ’র মতো আঁটসাঁট ও সংহত রূপ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করত। হয়ত অনুরুদ্ধ হয়ে লিখতে হতো বলে, এই লেখাগুলোতে তাঁর নিজের সংযোগ যতটা না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অন্যের অনুরোধ উপেক্ষা না করার মানবিকবোধ। এবং লক্ষ্য করব যে তিনি সাহিত্য সমালোচনার দরিদ্র ভূমি থেকে সরে গিয়ে কথাসাহিত্যে নিজের সৃজনশীল ঐশ্বর্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন। এতে করে কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। কথাসাহিত্যে তিনি এমন এক জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন যা আমাদের বাংলা সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এটা ঠিক যে কথাসাহিত্যকে তিনি আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়ে ভুল করেননি, কারণ এই জায়গাটিতে তিনি সত্যিকার অর্থেই খুব শক্তিশালী ছিলেন। চিরায়ত ও আধুনিক চিরায়ত সাহিত্য সম্পর্কে তিনি বোদ্ধা তো ছিলেনেই, এমনকি উত্তরাধুনিক সাহিত্য সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল খুব স্পষ্ট। ফলে, উত্তরাধুনিক কথাসাাহিত্যের অনেক কলাকৌশলকে তিনি সফলভাবে প্রয়োগও করেছিলেন গল্প ও উপন্যাসে। কিন্তু যে সমালোচনা-সাহিত্য আমাদেরকে চিনতে শেখায় সাহিত্যের অন্যান্য জনরার (Genres) স্বাতন্ত্র্য, সমৃদ্ধি ও অভিনবত্ব এবং বলতে গেলে যার অভাবে সোনাকেও আমরা অজ্ঞতার কারণে মূল্যহীন বলে মনে করি, সেই সমালোচনা সাাহিত্যকে তাঁর পাণ্ডিত্য, গভীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও আবিষ্কারপ্রবণ সত্তা থেকে বঞ্চিত রেখেছিলেন। সমালোচনা সাহিত্যকে আমরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজ মনে করি বলে, এই পথে আমাদের কৃতি অনেক কম। সাহিত্য সম্পর্কে বর্ণবাদী ধারণাবশত সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় একে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবাও সমালোচনা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী না হওয়ার একটা বড়ো কারণ। আমাদের কথাসাহিত্যে ও কবিতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্ট হলেও, একজন অক্তাবিও পাস, গিয়্যের্মো সুক্রে, এমির রদ্রিগেস মনেগাল-এর অভাবের কারণে নিজেদের সৃষ্টিশীল লেখকদের উচ্চতা ও তাঁর কৃতির পরিমাপ করতে পারি না। খনিজ বিশেষজ্ঞ জানেন কোথায় কোন মাটির তলায় রত্ন লুকিয়ে আছে, কিন্তু যে জানে না সে কেবল রত্নকে লুকিয়ে রাখা মাটির উপরিতলটুকুই দেখতে পায়, রত্নের কথা তার অজানাই রয়ে যায়। সমকালে বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন বলেই জীবনানন্দের মহত্তকে আমাদের পক্ষে চিনে ও মেনে নিতে সহজ হয়েছে। তা না হলে জন ডানের মতো কয়েক শ’ বছরের হিমাগারে থাকতে হতো এলিয়টের মতো সমালোচকের আবির্ভাবের অপেক্ষায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মধ্যে বড়ো একজন সাহিত্য সমালোচকের বিরাট গুণ ছিল, কিন্তু তিনি নিজে তা বিকশিত হতে দেননি। এটা আমাদের জন্য এক স্থায়ী আফসোস হয়ে থাকবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি অন্য যা-কিছু করেছেন তার কোনো গুরুত্ব নেই। ঘটনা হলো তিনি কথাসাহিত্য ব্যতীত অন্য যা-কিছু করেছেন তার সামাজিক মূল্য অবশ্যই আছে, যেমন আছে রবীন্দ্রনাথের এ ধরনের কাজগুলোর। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য সমালোচক হিসেবে দায়িত্বটিও পালন করেছিলেন পাশাপাশি। তাঁর পূর্ববর্তী, সমসাময়িক, এমনকি অনুজদের সম্পর্কে এত লিখেছেন যে কবিতা ও কথাসাহিত্যের তুলনায় তাঁর সমালোচনা সাহিত্যের পরিমাণ কোনো অংশে কম নয়। অত দূরেই বা যাচ্ছি কেন, আবদুল মান্নান সৈয়দের দিকে তাকালেও তো আমরা সেটা বুঝতে পারি। অথচ সৃজনশীলতায় মান্নান সৈয়দকে অপূর্ণ বা অসম্পন্ন বলা যাবে না কোনোভাবেই। সৃজনশীল রচনা ও সমালোচনার সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের অনিবার্যতা ও গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে অক্তাবিও পাস বলেছিলেন:

“সমালোচনা ও সৃষ্টি পরস্পর স্থায়ীভাবে সম্পর্কিত। কবিতা ও উপন্যাসে ভর করেই বেঁচে আছে সমালোচনা, কিন্তু একইভাবে এ সমালোচনা সৃষ্টিরই পানি, রুচি ও বাতাস। অতীতে ‘মতবাদের দেহ’ গঠিত হতো সংস্কারাবদ্ধ ধ্যানধারণায়: দান্তে পুষ্ট হয়েছিলেন ধর্মতত্ত্ব, গংগোরা পৌরাণিক কাহিনি দ্বারা। আধুনিকতাই একে তুলে ধরেছে: এ কোনো পদ্ধতি নয়, বরং সব পদ্ধতির দ্বন্দ্ব ও নেতিকরণ। আধুনিক কালের সব শিল্পী—বোদলেয়ার থেকে কাফকা, লিওপার্ডি থেকে রুশ ফিউচারিস্ট—সবারই প্রধান উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সমালোচনা।”(মেক্সিকান মনীষা, সম্পাদনা রাজু আলাউদ্দিন, বেঙ্গলবুকস, ২০২৫, পৃ ৪৭-৪৮)

উভয়ের এই অভিন্ন বন্ধন সম্পর্কে আমরা উদাসীন হলেও রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু কিংবা মান্নান সৈয়দ সে-রকম ছিলেন না। আমরা একটাকে উঁচু আর অন্যটিকে নিচু ভাবার যে-সাহিত্যিক বর্ণপ্রথার প্রশ্রয় দিয়ে থাকি তা যে কত হাস্যকর তা বোঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সেটা বুঝতেন, তাঁর সূচনায় সেই স্বাক্ষর স্পষ্টভাবেই ছিল। ফলে আমাদের অনেকেই তাঁর এই বিরল গুণের কারণে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম।

২.মনজুরুল ইসলাম লেখার ব্যাপারে অলস ছিলেন না, যদিও তাঁর সেই জনপ্রিয় কলামটির নাম ছিল ‘অলস দিনের হাওয়া’, কিন্তু ওই হাওয়া নিরলস এক পরিশ্রম থেকে উদ্ভূত। তিনি খুবই পরিশ্রমী ছিলেন: অসংখ্য সভা-সেমিনারে তাঁকে যোগ দিতে হতো, কারণ এই কাজটি করার যোগ্য হয়ত অন্য কেউ ছিলেন না। লিখেছেন সমসাময়িক নানা সংকট ও বিষয় নিয়ে। সেসব লেখায় তাঁর প্রগতিশীল মনের, জনমুখিতার আর মননের স্পষ্ট এক প্রতিমা ফুটে উঠতো। শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন খুব নন্দিত ও জনপ্রিয়। তাঁর মতো পণ্ডিত ও মননশীল ব্যক্তি যে আমাদের অবক্ষয়ী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকতা করেছেন এটা ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক আশীর্বাদ। আমি তাঁর যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিল ১৯৯৬ সালে তার শিরোনামই ছিল “অনেক শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষকতার জন্য তৈরি হয়ে আসেননি”। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান এতই নিচে নেমে গেছে যে তারা কলেজ পর্যায় দূরের কথা, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষক হওয়ারও যোগ্য কিনা সন্দেহ। বিদ্যার এই রকম এক অবিশ্বাস্য দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে নিজের পাণ্ডিত্য ও সৃজনশীলতা নিয়ে লড়াই করতে হয়েছে। এরকম পরিবেশ যোগ্য মানুষটিকেও হতাশ করে দেয়ার মতো, কিন্তু মনজুরুল ইসলামের জীবনীশক্তি ছিল অদম্য। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সন্তান বা বন্ধুর মতো। ওদের কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতে, সঠিক পরামর্শটি দিতেন, ওদেরকে মমতার সাথে গ্রহণ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থেই এক আদর্শ শিক্ষককে হারালো তাঁর প্রয়াণে।

৩.তাঁর সাথে আমার সরাসরি পরিচয় সম্ভবত ১৯৯৩ বা ৯৪ সালে হবে। বহুবার তাঁর সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে। মাঝেমধ্যেই আমি তাঁর বিভাগে গিয়ে দেখাও করেছি। কখনো কখনো পত্রিকায় কাজের সূত্রে গিয়েছি তাঁর লেখা সংগ্রহের জন্য। একবার আমি আর বন্ধু ব্রাত্য রাইসু বোধহয় তাঁর লেখা সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আবাসস্থলে গিয়েছিলাম বিকেলবেলা। তিনি অত্যন্ত আলাপী ও রসিক ছিলেন যা অনেকেই জানেন। রাইসু তো ঠাট্টা মশকরায় একেবারে ওস্তাদ। মনজুর ভাইও রাইসুর এই রসবোধ ও রসিকতা খুব উপভোগ করতেন। আমি তাঁর ড্রয়িং রুমে তাকিয়ে দেখছি দেয়াল জুড়ে অসংখ্য মুখোশ, একেকটা একেক দেশের, একেক জাতির; জাতি না বলে আদিবাসী বলাই ঠিক। আমি ওসব বিস্ময় নিয়ে দেখছি বলে তিনি ওগুলোর কোনটা কোন দেশের বা কোন আদিবাসীর তার বর্ণনা দিতে শুরু করলেন আমার কৌতূহল মেটাবার জন্য। তারপর বললেন, বুঝলে রাজু, মুখোশ খুব পছন্দের জিনিস। যখনই যেই দেশে যাই, সেখান থেকে একটা না একটা মুখোশ আমি নিয়ে আসি।” তিনি রসিক মানুষ, তাই মনে হলো, এই সুযোগটা আমিই বা ছাড়বো কেন! তাঁর কথা শেষ হতেই জিজ্ঞেস করলাম, “মনজুর ভাই, মুখোশ আপনার যেহেতু এতই পছন্দ, ভাবছি রাতে আপনি মুখোশ পড়েই ঘুমান কিনা।” রাইসু এবং মনজুর ভাই, দুজনে হো হো করে হেসে উঠলেন। অন্য কোনো শিক্ষক হলে নিশ্চয়ই খুব রাগ করতেন, হয়ত বেয়াদবও ভাবতেন, কিন্তু মনজুর ভাই একেবারে বন্ধুর মতোই আমাদের রসিকতাকে গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৯৬ সালে তাঁর একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম বাংলাবাজার পত্রিকার জন্য, এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলাম তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে বসে। সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি ছিল সমাজ, রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার অধঃপতন নিয়ে। কারণ তিনি তখন এসব বিষয়ে লিখে পাঠকদের কাছে নন্দিত হয়ে উঠেছিলেন, ফলে এসব বিষয়েই নিতে হয়েছিল সাক্ষাৎকারটি। পরে শিল্প সাহিত্য বিষয়ে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা আমি ভেবেছিলাম, কিন্তু সেটা ওই ভাবনাতেই অকালমৃত্যু বরণ করেছে। আমি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে উৎসাহী বলে তিনি মাঝেমধ্যে এদের সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মুগ্ধতার কথা বলতেন। অনেকেই হয়ত জানেন না যে তিনি স্প্যানিশ ভাষা শেখার জন্য অনুবাদক আলী আহমেদ ও মনজুর ভাই ভাষা ইনস্টিটিউট-এ স্প্যানিশ ভাষার কোর্সও গ্রহণ করেছিলেন। আমি যখন ফিরে এলাম তিনি আমার সাথে অনেকটা রসিকতার ছলেই প্রাথমিক কিছু সম্বোধন ও আলাপচারিতা স্প্যানিশে শুরু করে তারপর বাংলায় চলে আসতেন। আমি জানতাম তিনি সৈয়দ মুজতবা আলীর নাতি ছিলেন। তিনি জানতেন আমি মুজতবা আলীর বিরাট ভক্ত একদিন তাঁকে বললাম যে মনজুর ভাই, সবাই নিজেকে মুজতবা আলীর ভক্ত বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। কিন্তু আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে কিন্তু সেই অর্থে আলোচনা বা মূল্যায়ন হয়নি। সবাই তাঁকে গুরু বলে, ওস্তাদ বলে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তাঁকে নিয়ে লেখা তো আসলে সেভাবে নেই। আপনি যদি একটা উদ্যোগ নিতেন তাঁকে নিয়ে একটা সংকলন প্রকাশের তাহলে খুব ভালো হতো। যোগ্য লেখকরা মুজতবা আলীর নানা দিক নিয়ে নানান জনে লিখবেন। মনজুর ভাই আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং তিনি একমত হয়ে বললেন, “তুমি কিন্তু ঠিকই বলেছ, সবাই তাঁর ভক্ত, তাঁকে নিয়ে লিখেছেন খুব কম লেখকই। শোন, কাজটা আমি একা নয়, তুমিও এর সাথে থাক, চল, আমরা দুজনে মিলেই কাজটা করি। আমি তোমাকে সবধরনের সহযোগিতা করব। আমরা আগে একটা লেখক তালিকা তৈরি করি। তারপর কাকে দিয়ে কোন লেখা লেখানো যায় সেটা আগে নির্ধারণ করি।” মোটামুটি এই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ফেঁদেছিলাম প্রায় ৭/৮ বছর আগে, আমার আলস্য আর তাঁর অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে সেটি পরিকল্পনা থেকে আর এক পাও আগায়নি। মনজুর ভাইয়ের সাথে একবার একটা লম্বা আড্ডা হয়েছিল ২০০৯ সালে যখন বোর্হেসের অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি-জিওভান্নি ঢাকায় এলেন। কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন তাঁর বাসায় নরম্যানসহ আমাদের বেশ কয়েকজনকে নৈশভোজের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেখানে কবি বেলাল চৌধুরী, কায়সার হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী এবং আরও দুএকজন ছিলেন। পানে ও ভোজে এক দারুণ আড্ডা হয়েছিল। রবিউল ভাইয়ের বাসাটা ছিল এক জাদুঘরের মতো, দুনিয়ার যত নানা রকম শিল্পকর্মে বোঝাই তার বাসাটি। একটি কক্ষে ছিল দুটি দোলনা। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি নরম্যান এবং মনজুর ভাই দুই দোলনায় পাশাপাশি বসে ঝুলন্ত অবস্থায় গল্প করে যাচ্ছেন। দৃশ্যটা যেমন সুন্দর, তেমনি খানিকটা কৌতুকরও। আড্ডা শেষে যখন নরম্যানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি কক্ষে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি নানান কথার ফাঁকে কায়সার হক আর মনজুর ভাইয়ের খুব প্রশংসা করেছিলেন। মনজুর ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিয়ে নাকি তিনি বেশ আনন্দ পেয়েছেন তাঁর অতুলনীয় রসবোধের কারণে। আমি পরে মনজুর ভাইকে সে কথা জানিয়েও ছিলাম। তিনি মৃদু হেসে তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ের সাথে গ্রহণ করে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। আরেকবার, তাঁর একটা বক্তৃতা শুনে বললাম, আপনার বক্তৃতা খুব ভালো হয়েছে। উত্তরে যা বললেন সেটা শুনে বেশ মজা পেয়েছিলাম। তিনি বললেন, তুমি উড়োজাহাজে উঠে তারপর গন্তব্য পৌঁছে যদি বলো, পাইলট খুব ভালো চালিয়েছে, তাহলে ব্যাপারটা কী রকম দাঁড়ায় বলতো? পাইলটের কাজই হচ্ছে ভালো চালানো, ওভাবেই সে প্রশিক্ষিত। আমিও তাই। এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই, রাজু। আমরা শিক্ষক, সুতরাং এইটুকু যোগ্যতা না থাকলে শিক্ষক হওয়া যায় না।

৪. jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68eb95c05eb8b" ) ); ৯৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে আমার অনুবাদে ‘টেড হিউসের নির্বাচিত কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছিল। সবাই জানেন, ওখান থেকে বই প্রকাশের আগে তা দুজন রিভিউয়ার (পরীক্ষক)-এর কাছে পাঠানো হয়। পরীক্ষকরা দেখে অনুকূল মতামত জানালে তবেই শুধু বইটি প্রকাশিত হতে পারে। এই বইটি বেরোবার পেছনে বেশ কিছু ঘটনা আছে যা আমি বাংলা অ্যাকাডেমির সাবেক মহাপরিচালক হারুন স্যারের কাছ থেকে জেনেছিলাম। বইটি বেরিয়ে যাওয়ার অনেক বছর পর স্যার এক সাক্ষাতে আমাকে বললেন, “তুমি তো জান না কী হয়েছিল তোমার টেড হিউস নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষকের কাছে পাঠিয়েছিলাম, তারা দুজনই নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। পরে আমি এটি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কাছে পাঠাতে বলি।” এবং ঘটনা হলো সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম পাণ্ডুলিপি দেখে অনুকূল মন্তব্য দিয়েছিলেন বলেই বইটি বেরুতে পেরেছিল। আমার ওই প্রথমদিককার একটি বইয়ের প্রকাশের ব্যাপারে তাঁর এমন ভূমিকা ছিল, সেটা হারুন স্যার না বললে কখনোই জানা হতো না। কারণ বাংলা একাডেমি এই কাজটা করেন উভয় (লেখক এবং রিভিউয়ার) পক্ষকে না জানিয়ে। লেখককে তারা কখনোই জানতে দেন না কে ছিলেন তার বইয়ের রিভিউয়ার। স্বাভাবিকভাবেই আমিও সেটা জানতাম না। যেহেতু বিষয়টা গোপনীয়, এই কারণে বইটি প্রকাশের পর তাঁকে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানানো হয়নি কখনোই। তিনিও কখনো সেটা বলেননি। বলার কথাও নয়। তা ছাড়া, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে এরকম কত সব পাণ্ডুলিপির যে পরীক্ষক হন, তার কোনো হিসেব তাঁরা নিজেরাও কি জানেন! উপরন্তু, মনজুর ভাই, পরীক্ষক হওয়া ছাড়াও বাংলাদেশের কত সব সাংস্কৃতিক ও লেখালেখির কাজে জড়িত ছিলেন, ফলে এই ছোট্ট ঘটনার কথা তাঁর মনে থাকার কথাও নয়।

তাঁর সাথে জনসমক্ষে শেষ দেখা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেঙ্গল গ্যালারি আয়োজিত কালি ও কলম-এর এক অনুষ্ঠানে। আমার সেখানে থাকার কথা ছিল না। বন্ধু ও কবি তারিক সুজাত আমাকে ওই দিনই ফোন করে জানালেন চিন্ময় দা এখন ঢাকায়। চিন্ময় দা ঢাকায়! বলেন কি! কোথায়ও এর কোনো আভাস তো শুনতে পাইনি! বললেন, আজকে বিকেলে ৬টায় বেঙ্গলে তার বক্তৃতা আছে। তারিক এও জানালেন, তার টাইট শিডিউল। পরশুদিন সকালে তিনি চলে যাবেন। তাহলে তো আজই দেখা করতে হয়। আমার এই প্রিয় মানুষটিকে লেখায় আর কণ্ঠস্বরে চিনলেও, রক্তমাংসের মানুষটিকে ঢাকায় পেয়েও চেনা হবে না, তা কী করে হয়! সেই কারণেই ওখানে যাওয়া। ওখানে প্রবেশ করতেই পেয়ে গেলাম মনজুর ভাইকে। তিনি আমাকে দেখা মাত্রই, তাঁর স্বভাবসুলভ সৌজন্য মধুর সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন, “আরে, তুমি এসেছ! ভালো হলো তোমাকে এখানে পেয়ে। কেমন আছ তুমি? তোমার মেক্সিকান বউ মারিসোল কেমন আছে?” সংক্ষিপ্তভাবে তাঁর কুশলাদির জবাব দিলাম। এরপরই তিনি বললেন, “ভেবেছিলাম এবার তোমাকে পুরস্কারটা দেবে। তুমি এটা অনেক আগে থেকেই ডিজার্ভ কর।” আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী উত্তর দেব। কিন্তু আমার অনিচ্ছার বিরুদ্ধেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল এমন এক উত্তর যার জন্য উনি হয়ত প্রস্তুত ছিলেন না: “মনজুর ভাই, আমাকে ওরা ফকিন্নি ভাবে না বলেই পুরস্কারটা দিচ্ছে না। এটা এখন ফকিন্নিদের দ্বারা ফকিন্নিদের জন্য এক পুরস্কার।” আমি জানি, এই উত্তরটা তাঁর জন্য বিব্রতকর ছিল। আমি নিজেও বলার পর ভেবেছি এরকম না বললেই পারতাম, কারণ তিনি তো আমার সত্যিকার অর্থেই শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন বলেই কথাটি বলেছিলেন। আমার এই উত্তর শুনে তিনি হয়ত ব্যথিত বোধ করে থাকতে পারেন। কিন্তু কথাটা যে তাঁর উদ্দেশ্যে ছিল না, তিনি নিশ্চয়ই সেটা বুঝতে পেরেছেন। এরপর তিনি বিষয়টাকে সহজ করার জন্য আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “চলো, ভেতরে যাই।”

মনজুর ভাইয়ের সাথে আমার সর্বশেষ দেখা মাস কয়েক আগে তাঁর বাসায়। প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আবেদীন কাদের ভাই আমার জন্য একটা বই পাঠিয়েছিলেন মনজুর ভাইয়ের মাধ্যমে। মনজুর ভাই আমাকে ফোন করে জানালেন, বইটা যেন তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করে তাঁকে নির্ভার করি। এক সন্ধ্যায় তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় গেলাম। বইটি সংগ্রহের জন্য গেলেও, তাঁর সাথে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অনেক বিষয়ে কথা হলো। তাঁর এবং আমার প্রিয় সব লেখকদের নিয়েই কথা হচ্ছিল মূলত। দেশের এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর উদ্‌বেগের কথাও জানালেন। আমি কী লিখছি সে সব বিষয়েও জানতে চাইলেন খুব আগ্রহ নিয়ে। রুলফোর বাংলা অনুবাদ নিয়ে আমার একটা লেখা তাঁর চোখে পড়েছিল, বললেন সেটার কথাও। লেখাটি তাঁর খুব ভালো লেগেছে বলে সেই সূত্রে অনুবাদের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বললেন। অনুবাদ যে শুধু ভাষা জানার উপরে নির্ভর করে না, তা যে সাহিত্যের বিস্তৃত পাঠের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত, সেই কথাগুলো এত সুন্দর আর নানা রকম উদাহরণ দিয়ে বললেন যে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তাঁর কথাগুলো। বরেণ্য লেখক ও অধ্যাপক চিন্ময় গুহ’র প্রসঙ্গও উঠেছিল ওই শেষ দেখায়। চিন্ময় দার প্রবন্ধের তিনি ভূয়সী প্রশংসা করলেন আর দুঃখ করে বললেন, আমাদের দেশে এরকম প্রাবন্ধিকের কত অভাব। এলিয়ট নিয়ে চিন্ময় দার মৌলিক গবেষণার প্রসঙ্গটিও এলো। আমাদের দেশে আজকাল এই মানের গবেষণা হচ্ছে না বলে বেশ খানিকটা হতাশা প্রকাশ করলেন। মনজুর ভাই লেখক হিসেবে যেমন, তেমনি বক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। আজ খুব আফসোস হচ্ছে কেন সাহিত্য বিষয়ে তাঁর একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার আমি নিলাম না। আমার নিজের এই অবহেলার জন্য আমার নিজেকে আজ খুব ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে। আবার এও ভাবি, তিনি যে এভাবে হঠাৎ করে, প্রয়াণের কোনো আভাস না দিয়ে চলে যাবেন, তা তো আমরা কেউ-ই ভাবিনি। মৃত্যু যে অবিবেচকের মতো মাঝপথ থেকে কাউকে তুলে নিয়ে যাবে, তা কি আমরা কেউ ভেবেছি? প্রকাশক ও লেখক মাজহারুল ইসলাম ভাইয়ের মাধ্যমে যখন মনজুর ভাইয়ের অসুস্থতার ধারাবিবরণী পেতাম প্রতিদিন, তখনও ভেবেছি তিনি মৃত্যুর সাথে লুকোচুরি করে নিশ্চয়ই এবার জয়ী হয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু ভগবানের গুপ্তচর এই মৃত্যু যে বোর্হেসের ‘মৃত্যু ও কম্পাস’ গল্পের স্কারলাক-এর মতো নির্ভুল ছক কেটে বসেছিল তা এরিখ লনরট নামক মনজুর ভাই কি আর সেটা জানতেন! আমরাও কেউ অনুমান করতে পারিনি এই আকস্মিক প্রস্থানে কথা। গতকাল প্রকৃতির অঝোর কান্নায় তিনি আমাদের ভিজিয়ে দিলেন তাঁর বিদায়ি জানাজায়। কোনো কোনো মৃত্যু কেন এত বেশি ব্যথাতুর করে, এত বেশি বৃষ্টি ঝরায়?

“সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগেধূসর মৃত্যুর মুখ; একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিল—সোনা ছিল যাহানিরুত্তর শান্তি পায়; যেন কোন্ মায়াবীর প্রয়োজনে লাগে।”

আপনি কোন মায়াবীর প্রয়োজন মেটাতে চলে গেলেন, মনজুর ভাই?

Comments

0 total

Be the first to comment.

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র BanglaTribune | প্রবন্ধ/নিবন্ধ

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদের ছোটোগল্প ‘রূপা’, ‘শঙ্খমালা’ এবং ‘নন্দিনী’—প্রতিটি নামের অন্তঃস্থিত একগুচ্ছ বাস্তবতার...

Nov 13, 2025

More from this User

View all posts by admin