সৌদি আরবের মক্কায় অন্তত আট মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না ছয়শ’ শ্রমিক। ২৬ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন প্রকল্প ‘মাসার পুনর্গঠন’-এ যুক্ত ওই শ্রমিকরা উপায়ান্তর না দেখে বকেয়ার দাবিতে ধর্মঘট ডাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয় সৌদি সরকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ছয়শ জনের কথা জানা গেলেও, বেতনহীন শ্রমিকের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া অন্তত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
‘ভিশন ২০৩০’–এর আওতায় মক্কার মাসার প্রকল্পে বেইতুর কোম্পানিটি কাজ করছে, যার প্রধান ঠিকাদার উম্ম আল কুরা ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের আংশিকভাবে এখানে মালিকানা রয়েছে।
এইচআরডব্লিউয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপপরিচালক মাইকেল পেজ বলেন, এত বেশি অর্থ বিনিয়োগ থাকা প্রকল্পেও শ্রমিকদের বেতন প্রদান না করা সৌদি আরবের ভঙ্গুর মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রকাশ করে। এখন, চুক্তি অনুযায়ী বকেয়া দাবি করায় শ্রমিকদের ভয়ভীতি ও গ্রেফতারের মুখে পড়তে হচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে সংস্থাটি চারজনের সাক্ষাৎকার নেয়। যার মধ্যে দুজন ছিলেন বেইতুর কোম্পানির সাবেক শ্রমিক। একজন জানান, তার দেড় লাখ রিয়াল বা প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বেতন ও ভাতা বকেয়া রয়ে গেছে। অর্থাৎ, এখন দেশে ফিরে গেলেও এই পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে সন্দেহ থাকবে।
অবশ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষের রোষানলের আশঙ্কায় অনেক শ্রমিক কথা বলতে অস্বীকার করেন।
সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, পরিদর্শন ও মজুরি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেইতুরের অনিয়ম শনাক্ত এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে শ্রমিকদের দাবি, গত দুই বছর ধরে অনিয়মিতভাবে বেতন দেওয়া হয়েছে, আর শেষ আট মাসে কিছুই পাননি তারা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের শতাধিক শ্রমিক ওই প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
এইচআরডব্লিউ যাচাইকৃত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শ্রমিকরা ধর্মঘটে অংশ নিয়ে প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন— আমাদের বেতন পরিশোধ করো, বেইতুর কর্মকর্তারা কোথায় ইত্যাদি।
আটক শ্রমিকদের মধ্যে কয়েকজন জানান, রাজপুত্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তাদের আটক করে পুলিশ। দুই শ্রমিক বলেন, প্রসিকিউটর তাদের মুক্তির নির্দেশ দিলেও তাদের দুদিন কারাগারে রাখা হয়।
সৌদি আরবে স্বাধীন মতপ্রকাশ কঠোরভাবে সীমিত। এছাড়া, অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, দরকষাকষি বা ধর্মঘট নিষিদ্ধ। ফলে বর্তমানে খুব কম শ্রমিকই এইচআরডব্লিউ–এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে রাজি হয়।
তুরস্কের প্রগ্রেসিভ কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রধান ওজগুর কারাবুলুত বলেন, অন্য দেশে হলে আমরা প্রকাশ্যে আন্দোলন করতাম। কিন্তু এখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তবু লড়াই চলবে যতক্ষণ না তারা তাদের পাওনা ফেরত পায়।
কোম্পানিটি কর্তৃপক্ষকে বকেয়া পরিশোধের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে, তবে মন গলেনি শ্রমিকদের। তাদের অভিযোগ, আগেও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রক্ষা করা হয়নি।
সৌদি আরব বর্তমানে ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ১১টি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় বাস্তব সংস্কার না আনলে এসব প্রকল্প গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
মাইকেল পেজ বলেন, অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক পরিবার চালাতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অত্যন্ত কঠোর পরিবেশে কাজ করেন। তাদের প্রাপ্য বেতন না দেওয়া কোনওভাবেই ন্যায্য নয়।