বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী (৫৫) সরকার উৎখাতের মিশনে বাংলাদেশে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রেফতারের পর তার কাছে থাকা দুটি মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এখন তার সহযোগী ও সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে কাজ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
গত শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) মিন্টো রোডের মন্ত্রীপাড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। রবিবার রাজধানীর রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আদালতে তার রিমান্ড শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এনায়েতের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে এনায়েত করিম চৌধুরীর কাছ থেকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি মার্কিন পাসপোর্টধারী (পাসপোর্ট নম্বর-A34814791) এবং বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতের উদ্দেশে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে দেশে এসেছেন। ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় এসে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থান করেন এবং পরবর্তী সময়ে রাজধানীর অন্য ঠিকানায় বসবাস করতে থাকেন। তিনি সরকারি নীতিনির্ধারক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বর্তমান সরকার পরিবর্তন করে নতুন জাতীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছিলেন এবং সরকারি ও বেসরকারি উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থায় সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এনায়েত করিম চৌধুরী গত ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি নিজেকে অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থার চুক্তিভিত্তিক এজেন্ট দাবি করেছেন। এনায়েতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, তিনি সরকারের নীতিনির্ধারক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। রাজধানীর একটি হোটেল ও গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে অবস্থানকালে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন বলেও তথ্য মিলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনায়েতের মোবাইল ফোন ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এখনই সব কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। রিমান্ডে নিয়ে এ বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
গোয়েন্দারা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এনায়েতের যোগাযোগের সূত্র ধরে অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে কাজ করছেন। পাশাপাশি তার আগে বাংলাদেশ সফরগুলোর কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে এনায়েত পুলিশকে জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দুর্বল অবস্থায় আছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিনি একটি নতুন জাতীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য কাজ করছিলেন।
তার দাবি, ‘আমেরিকান সরকার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, আগামী ২১ অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেনাবাহিনী সমর্থিত নতুন সরকার গঠিত হবে। কে সরকার প্রধান হবেন এবং কারা অংশ নেবেন—তা আমেরিকা নির্ধারণ করবে বলে এনায়েত উল্লেখ করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, এনায়েত করিমের কার্যকলাপ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি জননিরাপত্তা বিনষ্ট করার উদ্দেশে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠাতেন।
এ বিষয়ে রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রেফতার এনায়েতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনের তথ্য আমাদের হাতে আছে।’