জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে এখনও সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনও সমঝোতা হয়নি। ইতোমধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও বিএনপি স্পষ্টভাবে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের মতো একটি দলের সঙ্গে কোনও আলোচনায় আগ্রহী নন দলটির নীতিনির্ধারকেরা।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ডাকা হলে বিএনপি সাড়া দেবে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে সরকারের বিষয়ে দৃশ্যত ‘শক্ত অবস্থান’ প্রদর্শন করবেন দলটির নেতারা। এক্ষেত্রে কৌশল ও সহনীয় হওয়ার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে বিএনপির। অন্যথায়, দেশে যেকোনও পরিস্থিতি, পরিবেশের দায় দলটির ওপর বর্তাবে— এমন আশঙ্কা রয়েছে দলটির।
গত দুই দিনে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, গণভোটকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তার পেছনে সরকারের কারও কারও অবদান রয়েছে। বিশেষ করে যেসব রাজনৈতিক দল দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় আলোচনা করেও একটেবিলে আসতে পারেননি, সেখানে গণভোটের সময় নির্ধারণে ঐকমত্য হতে দলগুলোর ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নতুন কিছুর ইঙ্গিত।
গত ৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আর গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে মতবিরোধ দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার সম্ভবত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ‘জুলাই জাতীয় চার্টার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করতে পারে এবং প্রস্তুতিও চলছে। খসড়া আদেশটি বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে দলগুলোর অবস্থান জানানোর সাত দিন পার হচ্ছে। এই যে সাতদিন সময় দিলো সরকার, সরকার কি কোনও মার্শাল ল’র সরকার নাকি। মার্শাল ল’য়ের সরকার হলে এমন সমন জারি করতে পারে। ওনারা সাতদিনের আল্টিমেটাম দেওয়ার আগে দলগুলোর সঙ্গে আলাপ করতে পারতো না!’
‘বিশেষ করে বিএনপি, যে দলটি সরকারের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার, যে দলটা সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা আছে, সে দলের সঙ্গেও আলোচনা করেনি’, বলে উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আলোচনা না করে উনি আল্টিমেটাম দিলেন। আল্টিমেটাম দিয়ে একটা দলকে দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হলো— তাতে বুঝা গেলো, ওনারা তাদের সঙ্গে (ওই দল) মিটিং করাতে চান সমঝোতা করার জন্য।’
বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, ‘আমরা ওই দলের সঙ্গে সমঝোতা করবো না। সমঝোতা করলে সরকারের সঙ্গে করতে হবে এবং সরকারের সঙ্গে সমঝোতা আমরা করেছিও। আমরা জুলাই সনদে সই করেছি, সই করার পর যদি কোনও কিছু যোগ করা হয়, সেটা সরকারের দায়িত্ব। আমাদের না।’
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের আগেই দলগুলোর সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবে সরকার।
আজ সোমবার (১০ নভেম্বর) স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক হবে। এই বৈঠকে গণভোট ইস্যু ও চলমান প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দলের একজন উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনটি কারণে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারছে না। প্রথমত, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি আন্দোলনের সরকার। দ্বিতীয়ত, তারেক রহমানের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকের মধ্য দিয়ে একটি সমঝোতা এসেছে। তৃতীয়ত, বিএনপি এখন প্রধান রাজনৈতিক দল, সেদিক থেকে সরকারকে সহযোগিতা করা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ নাই।
জটিলতার নেপথ্যে কি নির্বাচন পেছানো?
রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে আলোচনা আছে, চলমান গণভোট অনুষ্ঠান বিতর্কের পেছনে মূলত আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে পেছানো। যদিও সরকারের তরফে বারবার সঠিক সময়েই নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্র জানিয়েছে, গণভোটের সময় নিয়ে যে বিতর্ক চলমান, তা অনেকটাই সন্দেহজনক। বিশেষ করে গণভোটের অনুষ্ঠান নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে দুটি সময় নির্ধারণ করেছে, এরমধ্যেই একটি নির্ধারিত তারিখ রয়েছে (জাতীয় নির্বাচনের দিন)।
জামায়াত ও দলটির সঙ্গে যুক্ত কিছু ইসলামি দল গণভোট আগে চাইছে। একইসঙ্গে পরবর্তী সংসদেই যেন উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়, সে দাবিও রয়েছে জামায়াতের। এক্ষেত্রে জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলো চায়, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান। মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) জামায়াতসহ আটটি দলের রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করার কথা রয়েছে।
স্থায়ী কমিটির একাধিক সূত্রের দাবি, আগামী জাতীয় সংসদ পিছিয়ে গেলে দেশের পরিস্থিতি অশান্ত হবে। এমনকি নতুন কোনও পরিবেশের উদ্ভব হতে পারে।
বিএনপির প্রভাবশালী একাধিক দায়িত্বশীল জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ অনেকটাই সাময়িক। শেষ মুহূর্তে সরকার বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে বসতে পারে। এক্ষেত্রে উভয়দলকেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে যেকোনও পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বকে ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হবে, বলে উল্লেখ করেছেন দায়িত্বশীলেরা।
দলের দায়িত্বশীল সূত্রটি জানায়, দৃশ্যত বিএনপি শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে থাকলেও আদতে সহনশীল থাকবেন নেতৃত্ব। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার আগে পর্যন্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করার পক্ষে নেতারা।
এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে সোমবার দলের একজন দায়িত্বশীল বলেন, ‘চাপ দিয়ে সরকারকে মানানো যাবে না। সরকার আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন পিছিয়ে যাক বা সঠিক সময়ে হোক— বিএনপির সামনে আপাতত কঠোর হওয়ার পথ নেই। বরং সরকারকে সফল করতেই সহযোগিতা করতে হবে বিএনপিকে। তবে সরকার নিজে থেকে ব্যর্থ হলে বিএনপি সুবিধা পাবে, এমনটিও মনে করেন তিনি।
তিনি জানান, গণভোট না নিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে জামায়াত নির্বাচনে না যাওয়ার অবস্থান নিতে পারে। আবার আগে গণভোটের দিনক্ষণ দেওয়া হলে বিএনপি বয়কট করবে, সেদিক থেকে একটি অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এই অনিশ্চয়তার কারণে জাতীয় নির্বাচন পেছাতে পারে। সেই সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য দাবি করেন, নির্বাচন পেছালেই তৃতীয় শক্তির আগমন ঘটবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজনীতিতে দেশের জন্য যা কিছু কল্যাণকর মনে করবে, স্বাধীন মতামত দিতে পারাটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের একটি অর্থ। এখানে কেউ যদি অস্থির হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে তার মধ্যে উদারতা নাই, ধৈর্য নাই, সহনশীলতা নাই। নানা মত, নানা পথ তো থাকবেই। কিন্তু এইটা নিরসনের দায়িত্ব সরকারের। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক দল, স্টেক হোল্ডারদের যদি কোনও কর্তব্য থাকে, তারা সে দায়িত্ব পালন করবে। সরকারকে ইনিশিয়েটিভ নিতে হবে। দেখা যাক না, অসুবিধা নাই, ইনশাল্লাহ।’
আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর পর্যবেক্ষণ, সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর আর বৈঠক করার প্রয়োজন নেই। বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেই হয়।’
সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, সরকার নির্বাচনের দিন গণভোট ও আগামী সংসদে উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তা কেবল জানানো বাকি। তবে, সিদ্ধান্ত জানানোর আগে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য দেখানো জরুরি বলেও সরকার মনে করছে।
বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির অন্তত ১২ জন সদস্য গণভোটের বিপক্ষে ছিলেন। একজনের উদ্যোগে বিএনপি এই গণভোটে ঢুকেছে। আর এ কারণেই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
‘শেষ মুহূর্তে মেনে নেবে জামায়াত ও এনসিপি’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন যে বিরোধিতা, সেটা বড়কিছু নয়। নির্বাচনের দিন গণভোট নিয়ে দ্বন্দ্ব সেটা মিটে যাবে। শেষ মুহূর্তে জামায়াত নির্বাচনের দিনই গণভোট মেনে নেবে। এনসিপিও ইতোমধ্যে মেনে নিয়েছে। প্রশ্ন এখানে নয়, প্রশ্ন হচ্ছে ন্যূনতম সংস্কারের যে উদ্যোগ, সেটি নিশ্চিত হতে হবে।’
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত বলেছে বিএনপি যে, কমিশন প্রতারণা করেছে। কিন্তু সরকার কোনও বক্তব্য দেয়নি। আমরা তো সবকিছু স্পষ্ট করে আলাপের ভিত্তিতে যুক্ত করেছি। যেসব সিদ্ধান্ত এসেছে তা উল্লেখ করা হয়েছে, নোট অব ডিসেন্টসহ। ফলে, আমাদের তো প্রতারণা নেই। মূলত বিএনপি রাষ্ট্রপতির আদেশে সনদ বাস্তবায়নের বিপক্ষে।’
৩০ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনেও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদে সন্নিবেশিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলো কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ শিরোনামে একটি আদেশ জারি করবে। সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুসারে ‘আদেশ’ আইনের মর্যাদাপ্রাপ্ত। অতএব, সেটি জারি করা রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। বিএনপি মনে করে, সরকারের এমন আদেশ জারির এখতিয়ার নাই।’
যদিও কমিশনের সদস্য বলছেন, ‘সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরে তা হতে পারে। কিন্তু বিএনপি এটা মানছে না। ফলে, সংকট এখানে যে, বাস্তবায়নের আদেশটি কী রূপে ঘটবে, তা নিয়ে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘সরকার কি মার্শাল লয়ের সরকার? এটা একটি অন্তর্বর্তী নাগরিক সরকার। তাদের অবশ্যই গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ করা উচিত। খামোখা কোনও অপশন খোলার অর্থ হয় না। যেখানে দেশের আইনশৃঙ্খলাপরিস্থিতি ভালো না, দিনে দুপুরে খুন, রাহাজানি, সেখানে তাদের আইনশৃঙ্খলা উন্নতির দিকে নজর দেওয়া দরকার।’