বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আবারও বাণিজ্য উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েছে। উভয় দেশ এবার একে অপরের জাহাজে নতুন বন্দর ফি আরোপ করেছে। মঙ্গলবার থেকে এই পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ার পর বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এখন দুই দেশের ‘নতুন যুদ্ধক্ষেত্র’ হয়ে উঠছে।
আগামী মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা। তার আগেই দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ বৈঠকের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
নতুন বন্দর ফি কীভাবে কার্যকর হলো
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের এক নির্বাহী আদেশ ‘রিস্টোরিং আমেরিকার মেরিটাইম ডমিন্যান্স’-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোতে চীনা মালিকানাধীন, নির্মিত বা পরিচালিত জাহাজের জন্য অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করা হয়।
এই ফি অনুযায়ী:
এর প্রতিক্রিয়ায় ১০ অক্টোবর চীন ঘোষণা দেয়, মার্কিন মালিকানাধীন, পরিচালিত বা নির্মিত জাহাজের জন্য একইভাবে পাল্টা ফি আরোপ করা হবে। এর আওতায়:
চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয় বলেছে, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল ও বৈষম্যমূলক নীতির’ জবাব হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য উত্তেজনার পটভূমি
চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল ধাতুর রফতানিতে নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষোভ বাড়ে। এসব ধাতুই স্মার্টফোন, ব্যাটারি ও সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে অপরিহার্য। এরই পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়।
চীনের বন্দর ফি ঘোষণার পাশাপাশি মঙ্গলবার দেশটি দক্ষিণ কোরীয় জাহাজ নির্মাতা হানহওয়া ওশান কোম্পানির পাঁচটি মার্কিন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের চীনা বাণিজ্য তদন্তে সহযোগিতা করেছে।
মার্কিন পদক্ষেপের লক্ষ্য কী
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের উদ্দেশ্য হলো চীনের সমুদ্রবাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙা। গত মে মাসে পাঁচটি মার্কিন শ্রমিক ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কাছে অভিযোগ করে যে, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে বিশ্ব জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে অন্যায্য সুবিধা নিচ্ছে।
তদন্ত শেষে ট্রাম্প প্রশাসন চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনের কর্মকাণ্ডকে ‘মার্কিন বাণিজ্যের প্রতিবন্ধক’ বলে উল্লেখ করে। এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১৪২৬৯’ স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য আমেরিকার নৌশিল্পের পুনর্জাগরণ।
কংগ্রেসে এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, আমরা একসময় নিজেদের জাহাজ নিজেরাই বানাতাম। আবার সেই সময় ফিরিয়ে আনব। এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে।
শিপবিল্ডারস কাউন্সিল অব আমেরিকার সভাপতি ম্যাথিউ প্যাক্সটন ওই ঘোষণাকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন। তার ভাষায়, এটি মার্কিন জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান ও প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনবে।
বৈশ্বিক প্রভাব কতটা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নতুন ফি ও পাল্টা ফি বিশ্ব বাণিজ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় জাহাজ সংস্থা কসকো সবচেয়ে বড় আঘাত পেতে পারে; তাদের বার্ষিক ক্ষতি ৩২০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে তেলবাহী ট্যাংকারসহ অন্যান্য বাণিজ্য জাহাজে এই ফি কার্যত পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মার্কিন বন্দরগুলোতে অনেক ইউরোপীয় জাহাজ সংস্থা ইতোমধ্যে চীন-সম্পৃক্ত জাহাজগুলো সরিয়ে নিচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক শিপিং বিশ্লেষক এড ফিনলে-রিচার্ডসন বলেন, সব পক্ষই এখন নীরবে বিকল্প পথ খুঁজছে। অনেক জাহাজ মাঝপথে গন্তব্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
চীনের আধিপত্য কোথায়?
বিশ্ব জাহাজ নির্মাণে চীনের অবস্থান সুদৃঢ়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে নির্মিত বাণিজ্যিক জাহাজের ৫৩ শতাংশই চীনে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে মাত্র ০.১ শতাংশ।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা চায়না স্টেট শিপবিল্ডিং করপোরেশন (সিএসএসসি) একাই ২০২৪ সালে যে পরিমাণ জাহাজ নির্মাণ করেছে, সেটি ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব মার্কিন জাহাজ নির্মাতার সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
চীনের বিরল খনিজ রফতানি নিয়ন্ত্রণ, পাল্টা বন্দর ফি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক হুমকি—সব মিলিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ফের সংকটে পড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে দুই পক্ষ ৯০ দিনের এক বিরতি চুক্তি করলেও তা নভেম্বরের শুরুতেই শেষ হচ্ছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি এই উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে বিশ্ববাজারে আবারও বড় ধরনের মন্দা দেখা দিতে পারে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মুখোমুখি সংঘাত বেছে নেয়, চীনও প্রস্তুত। কিন্তু যদি সংলাপ চায়, দরজা সবসময় খোলা।
সূত্র: আল জাজিরা