ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আরও জোরদার ও শক্ত ভূমিকা পালন করার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে ইসি কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়াসহ বেশ কিছু পরামর্শ জানিছেন তারা।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নির্বাচনি সংলাপে এসব পরামর্শ দেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। এই সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, চার কমিশনার ও ৯ জন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং একজন পর্যবেক্ষক অংশ নেন।
নির্বাচনি সংলাপে অংশ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেবল আইন ও আইনের নির্দেশনা জারি করে ক্ষান্ত হলে চলবে না। স্বচ্ছতা দিয়ে ইসির কার্যক্রম চালাতে হবে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
এসময় নির্বাচনে আচরণভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই শক্ত অবস্থানে থাকার পরামর্শও দিয়েছেন নির্বাচন বিশেজ্ঞরা। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র পাহারা কমিটি গঠন, ইসি কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া, দলীয় সংশ্লিষ্টতা আছে— এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব না দেওয়া, নির্বাচনি এলাকায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার রাখা, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করা, বিগত তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের এবার নির্বাচনি দায়িত্ব না দেওয়া এবং কালো টাকা, অর্থ পাচারকারী ও ঋণ খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেন তারা।
গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করার জন্য সিইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক মুনিরা খান। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের আলোচনা হচ্ছে। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে করতে পারেন। আলাদা করলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। অনেকেই আলদা চাইতে পারে। কিন্তু আপনারা চেষ্টা করেন একইসঙ্গে দুইটা নির্বাচন করতে।
তফসিলের আগেই আচরণবিধি পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়ে সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার বলেন, এখনই বিভিন্ন দল, ব্যক্তিপর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। এটি ইসি একটি কমিটি করে মনিটর করে, যা তফসিলের পরে হয়। এটাকে নির্বাচনের আগে থেকে মনিটর করা যায় কিনা। মনিটর করতে পারলে নির্বাচনি পরিবেশ ভালো থাকে এবং নির্বাচনি কার্যক্রমও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মাহফুজা আক্তার। তিনি বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবার জন্য আমি কমিশনকে অনুরোধ করবো। যাতে আমরা মাঠে আচরণবিধিমালা সেভাবে পরিচালনা করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি অধ্যাদেশ জারি করে নির্বাচনি দায়িত্বগুলো প্রত্যেকের মধ্যে সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে দেয় এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়, তাহলে মনে হয় ভালো হয়। কারণ, রিটানিং অফিসারকে অনেক সময় দেখা যায়— নির্বাচনি দায়িত্ব পরিচালনা করতে গিয়ে কার্যত তার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারেন না। এই জিনিসগুলো আমাদের একটু জরুরি দেখা দরকার।
মাহফুজা আক্তার বলেন, নির্বাচন কমিশনেরও আরও জোরদার ও শক্ত ভূমিকা পালনা করতে হবে। শুধু আইন করে দিয়ে আর আইনের নির্দেশনা জারি করে দিয়ে ক্রান্ত হলে হবে না। আমাদের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরকে সেটা পরিচালনা করার বিষয়ে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা খন্দকার মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের আরপিওতে আছে সহকারী রিটার্নিং অফিসার একের অধিক কনস্টিটিউন্সিতে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার একাধিক নির্বাচনি এলাকায় থাকতে পারবেন। এক্ষেত্রে ছোট জেলায় খুব বেশি সমস্যা হয় না। কিন্তু বড় এলাকায় সমস্যা হয়। তাই আমার মনে হয়, নির্বাচন কমিশনার যদি মনে করেন— তাহলে একটি জেলায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার রাখতে পারেন।
আচরণবিধি নিয়ে খন্দকার মিজানুর রহমান বলেন, যেকোনোভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হবে। কোনও ব্যত্যয় নির্বাচন কমিশন প্রশ্রয় দেবে না।
জাতীয় নির্বাচন করতে প্রায় ১০ লাখ লোকবল দরকার উল্লেখ করে সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, নির্বাচন কমিশনের লোকবল আড়াই হাজার। ইসির বাইরে সরকারি, বেসরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে লোকবল নিয়োগ করা হয়। এসব লোকবল নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে এমন প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো দলীয় প্রতিষ্ঠান যেমন- ইসলামী ব্যাংকসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি মাথায় রেখে লোকবল নিয়োগ করতে হবে। বিগত তিন নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদেরকে নিয়োগে এড়ানোর যেতে পারে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমন ও সন্ত্রাসীদের কার্যকরভাবে আইনের আওতায় আনা, কালো টাকা, অর্থ পাচারকারী ও ঋণ খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণ করা এবং কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরের বেসামরিক প্রশাসনকে নিরপেক্ষ নিশ্চিত করতে হবে।
এসময় ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া, কম সংখ্যক ভোটার নিয়ে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের পরামর্শও দেন তিনি।
বিগত সাতটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইসির সাবেক উপ সচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, পোস্টার যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে, এখনই এটা বন্ধ করতে হবে। প্রতি ইউনিয়নে আচরণবিধি প্রতিপালন যদি এখনই করা যায়, তাহলে নির্বাচন অনেকটা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের শেষে সমাপনী বক্তব্যে গত তিন নির্বাচনের ভোটের দায়িত্বে থাকা সবাইকে বাদ না দেওয়ার যুক্তি তুলে ধরে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন,
গত তিনটা নির্বাচনে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের নিয়ে সবাই তো সন্দেহ পোষণ করে। তবে ভালো-খারাপ তো সবখানেই আছে। কিন্তু একদম অনেকে বলছেন, গত তিন নির্বাচনে যারা কাজ করেছেন, তারা যেন ধারে-কাছে না আসতে পারে। এখন ১০ লাখ লোকের (ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে সাধারণত) মধ্যে বাদ দিতে গেলে, কম্বলই উজাড়। লোম বাছতে গিয়ে কম্বল উজাড়-আমার অবস্থা হয়েছে সে রকম।
সিইসি বলেন, সুতরাং, তাদের কিছু নিতে হবে। তবে তাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হবে। মানুষ তো মানুষই। বিবেক আছে তো।
তিনি বলেন, আমরা ব্যাংক থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নেওয়ার কথা বলছি। আমাদের কাছে নানা কারণে অভিযোগ আসছে— রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার বিষয়ে। আমরা বিষয়টি লক্ষ্য রাখবো। যা করার আমরা করবো মোটামুটি।
সিইসি বলেন, দলীয় দলদাসের মতো কাজ করতে পারবেন না, সেটা আমরা নিশ্চিত করবো। কারও যদি রাজনৈতিক অভিলা থাকেও, সেটা বাস্তব কাজে প্রতিফলিত হবে না, সেটা আমরা নিশ্চিত করবো। কোনও পক্ষে কাজ করলে অ্যাকশন হবে। এখন কারও পক্ষে কাজ করলে অ্যাকশন হবে।
নির্বাচন করার দায়িত্ব তো কেবল ইসির না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা জাতীয় দায়িত্ব। ভোটের সময় ইসির ক্ষমতা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা পায়। আগে তো রাতে গিয়ে মোটিভেটেড করে কায়দা করে ভোটটা আদায় করে নেওয়া হয়েছে। এখন যত রকমের কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব আমরা নেবো, যাতে দলীয় আচরণ না করতে পারে।