দেশের স্বাস্থ্যসেবা, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস ও ওষুধ শিল্পের টেকসই উন্নয়নে যুগোপযোগী নীতিমালা ও সহজতর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়নের জটিলতা কমানো না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এই খাতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারবেন না।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই আয়োজিত “স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেসরকারী খাতের অংশগ্রহণ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক সেমিনারে এসব মত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান।
এপিআই শিল্পে ৪৭টি সংস্থার অনুমোদন দরকার
সেমিনারের মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, কাঁচামাল বা এপিআই উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে, যা ওষুধ শিল্পের জন্য বড় হুমকি। পাশাপাশি, লাইসেন্সিংয়ের জটিল প্রক্রিয়া শিল্পের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এপিআই শিল্প স্থাপনে একজন উদ্যোক্তাকে ৪৭টি সংস্থা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার অন্যতম কারণ। তিনি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর আহ্বান জানান।
যুগোপযোগী নীতিমালা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়
মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি আধুনিক ও কার্যকর নীতিমালা সময়ের দাবি। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং ইকোসিস্টেম গঠনে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রামের উর্ধ্বতন পরিচালক আকরামুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্সিংসংক্রান্ত জটিলতা না কমালে বেসরকারি খাতকে স্বাস্থ্যসেবা, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ও ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যাবে না।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ব্যাখ্যা
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক আসরাফ হোসেন বলেন, দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে অধিদফতর সর্বদা সচেষ্ট। কোনও প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে কিছুটা সময় লাগলেও ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হয় না।
সরকার লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ করছে
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, ওষুধ শিল্পের লাইসেন্সিং আরও সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। লাইসেন্সের মেয়াদ অন্তত তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় কাঁচামাল শিল্প গড়ে তোলা, গবেষণা বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের একার পক্ষে সকল নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে বিডা
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর মহাপরিচালক গাজী এ কে এম ফজলুল হক জানান, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস শিল্পের জন্য স্বতন্ত্র নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে বিডা। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মতামত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি এফবিসিসিআই’র
স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেন, আয়সীমা নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চিকিৎসা ব্যয় যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।
এর আগে বক্তব্যে এফবিসিসিআই মহাসচিব আলমগীর বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাজেটে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি জরুরি।
সেমিনারে এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক, ব্যবসায়ী নেতা এবং সাধারণ পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।