বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ যেন নতুন করে সংজ্ঞা লিখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগে শেয়ারবাজারের উত্থান ও বিটকয়েনের প্রতিযোগিতার মাঝেও স্বর্ণের দাম রেকর্ড ছুঁয়ে নতুন নিয়ম তৈরি করছে বিনিয়োগ জগতে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে প্রতি আউন্স সোনার দাম প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে। ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৫৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ। এই দাম বৃদ্ধিতে স্বর্ণ পিছনে ফেলেছে বিটকয়েনের ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ১৫ শতাংশ উন্নতিও।
সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা বাজারের ধসের আশঙ্কা দেখা দিলে স্বর্ণের দাম বাড়ে। বিপরীতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়লে এই ধাতু পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু এবারের উত্থান ব্যতিক্রম। কারণ স্বর্ণ, শেয়ারবাজার ও বিটকয়েন একসঙ্গে বাড়ছে।
পিকটে ব্যাংকের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট অরুণ সাই বলেন, যখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটে, মানুষ ইতিহাসে বারবার স্বর্ণের আশ্রয় নিয়েছে। এটা এক ধরনের মুদ্রার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা।
ফ্রান্সের বাজেট সংকট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজা শান্তিচেষ্টার প্রথম ইঙ্গিত; সব মিলিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যয়বহুল পরিকল্পনা, শুল্কনীতি এবং ফেডারেল রিজার্ভের ওপর চাপ ডলার ও ট্রেজারির ওপর আস্থা কমিয়েছে। ফলে বছরজুড়ে প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলার দুর্বল হয়েছে ১০ শতাংশ।
জেপি মরগান সিইও জেমি ডিমন সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
স্টেট স্ট্রিটের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাইকেল মেটকালফ বলেন, আমরা মুদ্রাস্ফীতির এক মোড় ঘোরানো বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি। শুল্কের প্রভাব বাড়লে ফেডের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে, আর স্বর্ণ তাতে আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল ডলার, শুল্কে অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা মিলিয়ে ২০২৫ সালে বিনিয়োগকারীদের নতুন নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে স্বর্ণ।
সাত উন্নত দেশের (জি–৭) গড় মুদ্রাস্ফীতি সেপ্টেম্বরে ছিল ২.৪ শতাংশ, যা এক বছর আগের ১.৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। বেশিরভাগ দেশ এখন সুদের হার স্থির রাখছে বা কমাচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন এবং নিজের ঘনিষ্ঠ স্টিফেন মিরানকে গভর্নর হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। আগস্টের পর থেকে স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
স্টোনএক্স–এর বিশ্লেষক রোনা ও’কনেল বলেন, বিনিয়োগকারীরা তাদের পোর্টফোলিওতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে স্বর্ণ যোগ করছেন। শেয়ারবাজারে বড় উত্থান ঘটলে কিছু লাভ স্বর্ণতেও স্থানান্তরিত হয়।
ইউবিএস–এর কৌশলবিদ জেরি ফাউলার বলেন, খুচরা বিনিয়োগকারীরা ইটিএফ–এর মাধ্যমে ব্যাপক হারে স্বর্ণ কিনছেন। প্রতিবার কেউ ইটিএফ–এ অর্থ রাখলে, তাতে প্রকৃত স্বর্ণের চাহিদাও বাড়ে।
রয়্যাল লন্ডন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ট্রেভর গ্রিথাম বলেন, মানুষ এখন যেমন এআই–এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী, তেমনি স্বর্ণকেও দেখছে এক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে। যদি এআই–চালিত বাজারে ধস নামে, স্বর্ণ আরও এক ধাপ ওপরে যাবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্বর্ণের এই উত্থানের মূল কারণ ডলারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার নির্ভরতা কমাতে এখন তাদের রিজার্ভের প্রায় এক–চতুর্থাংশ স্বর্ণে রাখছে।
নাটশেল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মার্ক এলিস বলেন, আমার মতে, স্বর্ণের দামের এই উল্মফনের প্রধান চালক ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার শুল্কনীতিই বিশ্ববাণিজ্য ও মুদ্রাবাজারের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।