স্যামসন এইচ চৌধুরীর আদর্শে এগিয়ে যাচ্ছে স্কয়ার গ্রুপ

স্যামসন এইচ চৌধুরীর আদর্শে এগিয়ে যাচ্ছে স্কয়ার গ্রুপ

সাড়ে তিন দশক আগের কথা। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করলেন। শুরু থেকে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ বিক্রির বিপরীতে ভ্যাট দেওয়া শুরু করলেও প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর অনেকেই সেটি পরিপালন করত না। ভ্যাট চালুর বছর দুয়েক পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রির হিসাব স্কয়ার ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তপন চৌধুরীর চোখে পড়ল। তিনি দেখলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত বিক্রির হিসাব গোপন করেছে।

তখন স্কয়ার ফার্মার কার্যালয় ছিল পুরান ঢাকার হাটখোলা সড়কে। তপন চৌধুরী বাবা স্যামসন এইচ চৌধুরীর কক্ষে গেলেন। বললেন, আমাদের প্রতিযোগীরা তো ঠিকমতো ভ্যাট দেয় না। মাথা তুলে স্যামসন এইচ চৌধুরী বললেন, তাতে কী? তপন চৌধুরী বললেন, তাঁরা তো অনেক টাকা সেভ করছে; প্রফিট বেশি করছে। তখন স্যামসন এইচ চৌধুরী ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি বোঝো, ভ্যাট কী?

এমন প্রশ্ন শুনে তপন চৌধুরী বিব্রত হলেন। স্যামসন এইচ চৌধুরী আবার বললেন—বলো, ভ্যাট কী? তপন চৌধুরী বলেন, ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স। —এই কর কে দেয়? —কাস্টমার (ক্রেতা)। —ক্রেতার কাছ থেকে এটা কে সংগ্রহ করে? —দোকানদার। —এখানে তোমার ভূমিকা কী? —দোকানদারদের কাছ থেকে করের টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংকের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়া। —তাহলে এটা কি তোমার টাকা? —না। —তোমার উৎপাদন খরচ ও মুনাফা কি পণ্যমূল্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে? —হ্যাঁ। —তার মানে হচ্ছে, ভ্যাট তোমার টাকা নয়। ঠিক আছে! তোমার উৎপাদন খরচ ও মুনাফা পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত আছে। তুমি সরকারের পক্ষে ভ্যাট সংগ্রহ করেছ। সেটি সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব তোমার।

বাবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজের কক্ষে এসে বসলেন তপন চৌধুরী। ভাবতে লাগলেন, পুরোনো জমানার লোক, খালি নীতিকথা...। এসব ধ্যানধারণা নিয়ে ব্যবসায় বেশি দূর এগোনো যাবে না। কয়েক মিনিট পর আবার স্যামসন এইচ চৌধুরী ডেকে পাঠালেন। পাশে বসালেন। তারপর বললেন, ‘শোনো, তুমি যাঁদের কথা বলছ, তুমি নিজেই হয়তো দেখবা, সেদিন হয়তো আমি থাকব না—এসব কোম্পানির অনেকেই কিন্তু ব্যবসায় থাকবে না। যদি এটাই তাদের ব্যবসার দর্শন হয়, তাহলে টিকে থাকতে পারবে না।’

নীতি–নৈতিকতা মেনে সততার সঙ্গে ব্যবসা করা স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরীকে নিয়ে এই স্মৃতিচারণা করলেন তাঁর মেজ ছেলে তপন চৌধুরী। তিনি বলেন, বাবার কথা শতভাগ ঠিক ছিল। ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যেই সেসব কোম্পানির অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

গত রোববার নিজের কার্যালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় তপন চৌধুরী বলেন, আমাদের বাবা সাধারণ অবস্থা থেকে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন শিল্পপতি হয়েছেন। সৎ পথে থেকে পরিশ্রম করে তিনি এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন। আমরা তাঁর দর্শন ও আদর্শকে ধারণ করেই স্কয়ার গ্রুপকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

১৯৫২ সালে ডাক বিভাগের চাকরি ছেড়ে বাবার হোসেন ফার্মেসিতে বসতে শুরু করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বছর চারেক পর বাবার কাছ থেকে টাকা ধার করে পাবনার আতাইকুলাতেই ই সন্স (ইয়াকুব অ্যান্ড সন্স) নামে ছোট ওষুধ কোম্পানি করলেন। সেটিকে বড় করতে তিন বন্ধুকে সঙ্গে নেন। কাজী হারুনূর রশীদ, পি কে সাহা ও রাধাবিন্দ রায়কে নিয়ে ১৯৫৮ সালে স্কয়ার নামে ওষুধ কোম্পানি চালু করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তখন তাঁদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার টাকা। চারজনের সমান বিনিয়োগ বলে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘স্কয়ার’।

চার বন্ধু মিলে কোম্পানিটি গড়ে তুললেও নেতৃত্বে ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। পাবনায় নিজ বাড়ির কাছেই কোম্পানির কারখানা করা হয়। শুরুতে স্কয়ার ফার্মা সিরাপ–জাতীয় ওষুধ তৈরি করত। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে কোম্পানির পরিসরও বড় হতে থাকে। ওষুধ দিয়ে শুরু করলেও স্কয়ার গ্রুপের ব্যবসা বর্তমানে আটটি খাতে বিস্তৃত—স্বাস্থ্যসেবা, ভোগ্যপণ্য, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, মিডিয়া, টিভি ও তথ্যপ্রযুক্তি; নিরাপত্তা সেবা; ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স; হেলিকপ্টার ও কৃষিপণ্য। তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। ২০ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে শুরু হওয়া স্কয়ার গ্রুপের বার্ষিক লেনদেন বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

কিংবদন্তিতুল্য শিল্পপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী জন্মশতবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর)। ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের আরওয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা ইয়াকুব হোসাইন চৌধুরী ও মা লতিকা চৌধুরী। ১৯৩২ সালে তিনি বাবার সঙ্গে পাবনার আতাইকুলায় আসেন। স্যামসন এইচ চৌধুরী কলকাতার বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকেই তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ ডিগ্রি পান। পরে তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর সহধর্মিণী প্রয়াত অনিতা চৌধুরী।

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি স্যামসন এইচ চৌধুরী পরলোকগমন করেন। তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর চার ছেলেমেয়ে—স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী ও রত্না পাত্র এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের অন্যতম পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানকে। স্যামসন এইচ চৌধুরীর নাতি-নাতনিরা ইতিমধ্যে স্কয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

আলাপচারিতায় বাবাকে নিয়ে অনেক স্মৃতির কথা বললেন তপন চৌধুরী। তিনি ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বললেন, ‘তখন আমাকে নিয়মিত সচিবালয়ে যেতে হয়। বাবাও ব্যবসায়িক কাজে যান। তাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিব্রতবোধ করতেন। একদিন এক সিনিয়র সচিব আমাকে বললেন, আঙ্কেল কষ্ট করে না এসে একটা ফোন করলেই তো কাজ হয়ে যায়। আমি সন্ধ্যার পর বাবাকে কথাটি বললাম। তখন বাবা বললেন, “আমি চেয়ারকে সম্মান করি। তোমার অবস্থানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। আমি সারা জীবন এভাবেই কাজ করেছি। যে কৃষক জমিতে যায় না, সে কোনো দিন ভালো ফসল আশা করতে পারে না।’”

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে উঠতে শুরু করে। তখন স্পিনিং মিল করার সিদ্ধান্ত নেয় স্কয়ার। পুঁজিবাজারে স্কয়ার ফার্মার শেয়ার ছেড়ে ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তারা। তার মধ্যে ৫০ কোটি টাকায় কালিয়াকৈরে স্কয়ার ফার্মার নতুন কারখানা স্থাপন ও বাকি টাকায় স্পিনিং মিল করা হয়। বর্তমানে গাজীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা ও হবিগঞ্জে স্কয়ারের বস্ত্র ও পোশাক কারখানা রয়েছে। স্কয়ার গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র রপ্তানিকারক।

শেয়ারবাজার থেকে টাকা ওঠানোর আগে স্যামসন এইচ চৌধুরী বিনিয়োগকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—যাঁরা স্কয়ার ফার্মার শেয়ার কিনবেন, তাঁদের টেক্সটাইলসের শেয়ার বিনা মূল্যে দেবেন; কিন্তু প্রক্রিয়াটি আটকে দেয় সরকার। তখন স্যামসন এইচ চৌধুরী উচ্চ আদালতে মামলা করেন। অবশেষে স্কয়ার টেক্সটাইলসের শেয়ার বিনা মূল্যে দেওয়ার পথ পরিষ্কার হয়।

তপন চৌধুরী বলেন, সমাজের সব ধরনের মানুষের সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল। তরুণ উদ্যোক্তাদের তিনি সব সময় উৎসাহ দিতেন। ব্যবসায় প্রতিযোগীদেরও তিনি পরামর্শ দিতেন। অথচ অনেকেই নিজের ব্যবসার গোপন বিষয় বলতেন না। তাঁর কথা ছিল, নিজের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা কেউ চুরি করতে পারে না। তা ছাড়া বাবা প্রচুর মানুষকে সাহায্য–সহযোগিতা করতেন; অথচ কাউকে বলতেন না। তার মৃত্যুর পর অনেকেই বলেছেন, বাবার সাহায্যের কারণে ডাক্তারি পড়াশোনা করতে পেরেছেন।

স্বল্প খরচে চিকিৎসা, থাকবে প্রবীণ নিবাস স্যামসন এইচ চৌধুরী ও অনিতা চৌধুরীর সন্তানেরা মা–বাবার স্মরণে একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন ‘অনিতা অ্যান্ড স্যামসন ফাউন্ডেশন’। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমিনবাজারে ৫০ বিঘা জমির ওপর একটি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, প্রবীণ নিবাস ও বাচ্চাদের একটি স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এই ফাউন্ডেশন। এ বছরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।

তপন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বাবা সাধারণ অবস্থা থেকে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন শিল্পপতি হয়েছেন। সৎ পথে থেকে পরিশ্রম করে তিনি এ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। দেশের মানুষ যেন তাঁকে মনে রাখেন, সেই চিন্তাভাবনা থেকেই আমিনবাজারে সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি স্কয়ার হাসপাতালের থেকেও বড় হবে। তবে চিকিৎসা ব্যয় হবে কম।’

তপন চৌধুরী আরও বলেন, বিদেশে পড়ালেখা করতে গিয়ে অনেকেই আর দেশে ফিরছেন না। মা–বাবার জন্য মাসে মাসে টাকা-পয়সা পাঠাচ্ছেন। তবে তাঁদের দেখাশোনা ও নিয়মিত চেকআপ কিংবা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। শহরের অবস্থাপন্ন পরিবারগুলোতে এই প্রবণতা বাড়ছে। তাঁদের কথা মাথায় রেখে প্রবীণ নিবাস করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। পাশে বাচ্চাদের একটা স্কুল থাকার কারণে নাতি-নাতনিদের শূন্যতাও কিছুটা হলে ভুলে থাকতে পারবেন প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দারা।

অনিতা অ্যান্ড স্যামসন ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রান্তিক এলাকার নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া রাজধানীর পথশিশুদের পড়াশোনার জন্য বিশেষ স্কুল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তারা যেন স্কুলে নিয়মিত আসে, তার জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।  

স্যামসন এইচ চৌধুরীর আদর্শে তৃতীয় প্রজন্ম

স্কয়ারের ব্যবসা পরিচালনায় বহু বছর আগেই পেশাদার কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা রেখেছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তাঁদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিয়ে যোগ্য করে গড়ে তোলেন। কর্মীদের নিজের পরিবারের একজন সদস্য মনে করতেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। এ জন্যই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন এমন কর্মীর সংখ্যাও প্রচুর। এমনও আছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম ধরে কাজ করছেন, এমন কথা বললেন তপন চৌধুরী।

তপন চৌধুরী আরও বলেন, ‘বাবা আমাদের ছোটবেলা থেকে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে বড় করেছেন। মানুষকে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। মনে আছে, নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় ২০ টাকা নিতে হলেও কাগজে সই করে নিতে হতো। ক্যাশিয়ার কাকা বলতেন, আমাকে তো হিসাব দিতে হবে। যাঁদের কাছে আমরা কাজ শিখেছি, তাঁদের আমরা চাচা ডেকেছি। আমাদের সন্তানদের সেভাবেই বড় করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বিশ্বাস, এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্যামসন এইচ চৌধুরীর আদর্শে এগিয়ে যাবে স্কয়ার।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

পাঁচ টাকা খরচে আয় এক টাকা Prothomalo | শিল্প

পাঁচ টাকা খরচে আয় এক টাকা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দেশের একমাত্র সরকারি কাচ কারখানা উসমানিয়া গ্লাস শিট দুই বছর ধরে বন্ধ। চট্টগ্...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin